বাংলাদেশে ওরশ শরীফ মানেই সাধারণত ধর্মীয় আলোচনা, মিলাদ-মাহফিল, জিকির-আজকার কিংবা তবারক বিতরণের আয়োজন। তবে সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে আধ্যাত্মিক স্মরণানুষ্ঠানকে মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্তে রূপ দিয়েছে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক ও আওলাদে রাসূল (দ.) আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রহ.)-এর ওরশ শরীফ উপলক্ষে তারা গৃহহীন পরিবারের হাতে নতুন ঘর তুলে দিয়ে উদযাপন করেছে এই পবিত্র আয়োজন।
রাউজান উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্তা এলাকায় শুক্রবার সকালে ছিল এমনই এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। ধর্মীয় আবহ, হামদ-নাত ও খতমে গাউসিয়ার মধ্য দিয়ে এক গৃহহীন পরিবারের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয় একটি সম্পূর্ণ নির্মিত সেমিপাকা ঘর। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্তা শাখা, খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া তাহেরিয়া এবং ওমদা মিয়া নূরানী কমপ্লেক্সের যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয় এই মানবিক কর্মসূচি। আয়োজকদের ভাষ্য মতে, আল্লামা তৈয়ব শাহ (রহ.)-এর শিক্ষা ও দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল মানবসেবা। তাই তাঁর ওরশকে কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্য দিয়ে স্মরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর আগে একই কর্মসূচির আওতায় আরও পাঁচটি গৃহহীন পরিবারকে সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ এই ঘর হস্তান্তরের মাধ্যমে সেই মানবিক ধারাবাহিকতা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উত্তর সর্তা শাখার সভাপতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ গোলাম রহমান। সংগঠনের স্থানীয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মাসুদ পারভেজের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন হলদিয়া ইউনিয়ন শাখার সভাপতি আলহাজ্ব মুহাম্মদ শাহ আলম। প্রধান বক্তা ছিলেন শাখার সাধারণ সম্পাদক মাস্টার মুহাম্মদ জামাল উদ্দীন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংগঠনের সহসভাপতি মুহাম্মদ ইউসুফ তালুকদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাস্টার মুহাম্মদ তহিদুল আলম, সহসম্পাদক ইমতিয়াজ আকবর, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, অর্থ সম্পাদক জিয়াউল হায়দার, সহ দাওয়াত খায়ের সম্পাদক হাফেজ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন কাদেরী এবং সিনিয়র সদস্য মুহাম্মদ হারুনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বক্তারা বলেন, আল্লামা তৈয়ব শাহ (রহ.)-এর জীবনাদর্শ ছিল আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ। তাঁর অনুসারীদের দায়িত্ব হলো সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতি ও সেবার সংস্কৃতি বিস্তার করা। তারা আরও বলেন, ধর্মীয় চেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত ইবাদতের অন্যতম অনুষঙ্গ। রাউজানের এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি ওরশ উদযাপনের ঘটনা নয়; বরং এটি ধর্মীয় মূল্যবোধকে মানবসেবার বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তরের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যেখানে জাঁকজমকের পরিবর্তে গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, আর আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানবতার বার্তা। সমাজকর্মীদের মতে সমাজে ধর্মীয় আয়োজনের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রত্যক্ষ অবদান রাখে। গৃহহীন একটি পরিবারের মাথার ওপর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে একটি স্থায়ী মানবিক বিনিয়োগ। ফলে ওরশের চেতনাকে বাস্তব জীবনের কল্যাণমূলক কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওরশের মর্মবাণী যে কেবল স্মরণে নয়, কর্মে-গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের এই উদ্যোগ যেন তারই জীবন্ত প্রতিফলন।

