কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের প্রধান সমস্যা ছিল ‘লোডশেডিং’। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যেত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্ধকারে থাকত। তবে ২০২৬ সালের মধ্যে এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সাশ্রয়ী বিদ্যুতের সন্ধান থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন বিশ্বের অন্যতম সফল বিকেন্দ্রীকৃত (Decentralized) সৌর বিপ্লবে পরিণত হয়েছে।
সূর্যের প্রখর তাপ এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পাকিস্তান এখন জ্বালানির জন্য আমদানিকৃত ব্যয়বহুল খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে।
১.তৃণমূলের বিপ্লব: গ্রাহকদের হাত ধরে পরিবর্তন
অনেক দেশে সরকারের বড় বড় প্রকল্পের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের পরিবর্তন আসে, কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এটি শুরু হয়েছে সাধারণ মানুষের হাত ধরে। ২০২২-২৩ সালে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক দাম এবং লোডশেডিংয়ের অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা নিজেরাই সমাধান খুঁজতে শুরু করেন।
* *প্যানেল আমদানির হিড়িক:
শুধু ২০২৪ সালেই পাকিস্তান ১৭ গিগাওয়াট (GW) ক্ষমতার সোলার প্যানেল আমদানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এর ফলে পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সোলার প্রযুক্তি আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়।
* *ছাদে ছাদে বিদ্যুৎ কেন্দ্র:*
২০২৬ সালের শুরুর দিকে ছাদে বসানো সোলার প্যানেলের মাধ্যমে প্রায় ৫.৩ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জিত হয়। এই ‘নীরব বিপ্লব’ দিনের বেলার বিদ্যুতের চাহিদার বড় একটি অংশ মেটাতে সক্ষম হচ্ছে।
২. বড় অবকাঠামো ও সরকারি প্রকল্প
ব্যক্তিগতভাবে ছাদে সোলার বসানোর পাশাপাশি সরকারিভাবেও বড় বড় ‘সোলার পার্ক’ তৈরি করা হয়েছে যাতে জাতীয় গ্রিড শক্তিশালী থাকে। প্রকল্পের নাম:
কায়েদ-এ-আজম সোলার পার্ক: অবস্থান: বাহাওয়ালপুর, পাঞ্জাব , ক্ষমতা: ১,০০০ মেগাওয়াট , বর্তমান অবস্থা(2026):সম্পূর্ণ চালু ।
লাইয়া সোলার পিভি পার্ক: অবস্থান: লাইয়া, পাঞ্জাব, ক্ষমতা: ১,২০০ মেগাওয়াট, বর্তমান অবস্থা(2026): ২০২৬-এ চালু হয়েছে।
ওরাকল গ্রিন হাইড্রোজেন পার্ক, অবস্থান: থাট্টা, সিন্ধু, ক্ষমতা: ৭০০ মেগাওয়াট (সোলার), বর্তমান অবস্থা(2026):নির্মাণাধীন
চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (CPEC) সহায়তায় তৈরি এই প্রকল্পগুলো ভারী শিল্প কারখানায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
৩. অর্থনৈতিক প্রভাব ও অর্থ সাশ্রয়
সোলার শক্তির ব্যবহার শুধু বাতি জ্বালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি পাকিস্তানের অর্থনীতিকেও সচল করেছে। ২০২৬ সালের মধ্যে সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দেশটির কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে।
আমদানি হ্রাস:বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সাল থেকে সৌরশক্তির ব্যবহারের ফলে পাকিস্তান তেল ও গ্যাস আমদানি ઘ (BESS)** এর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৪ সালে দেশটি ১.২৫ গিগাওয়াট আওয়ার ক্ষমতার লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আমদানি করেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৯ গিগাওয়াট আওয়ার-এ পৌঁছাবে। এতে দিনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতেও ব্যবহার করা যাবে।
৫. নতুন নীতিমালা: নেট মিটারিং থেকে নেট বিলিং
সৌরবিদ্যুতের এই বিশাল প্রবাহ সামাল দিতে সরকার ‘প্রোজিউমার রেগুলেশন ২০২৬’ চালু করেছে। এর মাধ্যমে নেট মিটারিং ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করা হয়েছে, যাতে সোলার ব্যবহারকারীরা যেমন সাশ্রয় করতে পারেন, তেমনি জাতীয় গ্রিড রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বজায় থাকে।
উপসংহার
বিদ্যুৎ ঘাটতির দেশ থেকে সৌরশক্তিতে আঞ্চলিক নেতায় পরিণত হওয়া পাকিস্তানের এই গল্পটি বিকেন্দ্রীকৃত জ্বালানির ক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ। সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করে এবং বড় বড় সোলার পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে পাকিস্তান একটি টেকসই ও স্বনির্ভর জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছে।

