চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শন মহামুনি বিহার প্রাঙ্গণে আগামী সোমবার (১৩ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘মহামুনি মেলা’। প্রায় ১৮৪ বছরের প্রাচীন এ মেলা দেশজুড়ে আদিবাসী-বাঙালির এক অনন্য মিলনমেলা হিসেবে সুপরিচিত। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘জুম্ম মেলা’ নামেও পরিচিত।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এবারের আয়োজনে দুই লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটবে। চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ দলে দলে মহামুনি বিহারে সমবেত হন। কেউ যানবাহনে, কেউবা পায়ে হেঁটে এসে পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করেন।

মহামুনি বিহার সূত্রে জানা যায়, বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু চাইঙ্গা ঠাকুর ১৮০৫ (মতান্তরে ১৮১৩) খ্রিষ্টাব্দে এখানে মহামুনি তথা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে মং সার্কেলের রাজা কুঞ্জ ধামাই এই বিহার প্রাঙ্গণে মেলার সূচনা করেন। সেই ধারাবাহিকতায় চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে এ মেলা আজও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। মেলার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে মহামুনি বিহার পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কেতন মুৎসুদ্দী জানান, পুণ্যার্থীদের থাকার ও বিশ্রামের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে নেওয়া হয়েছে কঠোর নজরদারি। পাশাপাশি মঞ্চায়নের মাধ্যমে আদিবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পরিবেশনার আয়োজন রাখা হয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায়ও নজরদারি থাকবে, যাতে কোনো দোকান অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করতে না পারে।
মন্দির উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির প্রশাসক অনুপম বড়ুয়া বাবুল বলেন, একসময় অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গ থেকেও দর্শনার্থীরা এ মেলায় অংশ নিতেন। বর্তমানে এটি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বৌদ্ধ আদিবাসী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর এক বৃহৎ মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। মেলায় আগত পুণ্যার্থীরা মহামুনি দিঘিতে স্নান শেষে বিহারে পূজা, সমবেত প্রার্থনা এবং বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের রাত্রিযাপনের জন্য বিহার প্রাঙ্গণ ও চাইঙ্গা ঠাকুর উদ্যানে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনও নিয়েছে বহুমাত্রিক উদ্যোগ। রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. রাহাতুল ইসলাম জানান, পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ সাজেদুল ইসলাম পলাশ বলেন, সাদা পোশাকে টহলসহ সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারি থাকবে। এদিকে, মেলায় আগত আদিবাসীসহ সকল দর্শনার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মেলা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাম পুলিশ কাজ করবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান অর্পিতা মুৎসুদ্দি। তিনি বলেন, মহামুনি মেলা এ অঞ্চলের প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ, যা দেশজুড়ে সমাদৃত। এদিকে, চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষকে ঘিরে দুই দিনের বর্ণিল কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ১৩ এপ্রিল আদিবাসীদের চৈত্রসংক্রান্তি অনুষ্ঠান শেষে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে আনন্দ শোভাযাত্রার মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিহারে এসে বুদ্ধ পূজায় অংশ নেবেন। পরে মহামুনি বটমূল খ্যাত ফনীতটি মঞ্চে গ্রামের দুই সামাজিক সংগঠন মহামুনি তরুণ সংঘ ও মহামুনি সংস্কৃতি সংঘের আয়োজনে নৃত্য-গীত, নাটক, মূকাভিনয় ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা হবে। এছাড়াও মহামুনি তরুণ সংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে সর্বপ্রথম এশীয় ডি-লিট ডিগ্রি প্রাপ্ত বাঙালি ভারততত্ত্ববিদ, পালি ও বৌদ্ধশাস্ত্রে পণ্ডিত এবং লেখক ড. বেণীমাধব বড়ুয়া স্মৃতি তর্পণ।
মেলাকে ঘিরে প্রবাসী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত মানুষও গ্রামে ফিরে আসেন, ফলে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় এক আনন্দঘন পুনর্মিলনী পরিবেশ। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে অনেকেই সরাসরি মেলায় অংশ নিতে না পারলেও তাদের হৃদয়ে এ উৎসব ঘিরে থাকে গভীর আবেগ ও স্মৃতিচারণা। ভারতের মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে বসবাসকারী কান্তা বড়ুয়া মুঠোফোনে বলেন, কর্মব্যস্ততা ও পারিবারিক কারণে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মহামুনি মেলায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে মেলার সময় এলেই তার মন পড়ে থাকে দেশের মাটিতে। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, স্কুল শেষে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মহড়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কাঁচা আম খাওয়া এবং পহেলা বৈশাখে নতুন পোশাক পরে আনন্দ শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়ার দিনগুলো আজও তাকে নাড়া দেয়। মন্দিরে যাওয়া, বাড়িতে অতিথি আপ্যায়ন ও সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সেই সময়গুলো তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন।
অন্যদিকে, কক্সবাজারের চকরিয়া থানায় কর্মরত পুলিশ উপ-সহকারী পরিদর্শক জুয়েল বড়ুয়া জানান, মহামুনি মেলার দিনটি তাদের জন্য বিশেষ উৎসবের দিন। দায়িত্ব যেখানেই থাকুক না কেন, এ দিনটিকে কেন্দ্র করে গ্রামে ফেরার চেষ্টা করেন। তবে পেশাগত দায়িত্বের কারণে অনেক সময় তা সম্ভব হয় না, যা তার জন্য বেদনাদায়ক। স্থানীয়দের মতে, এই মেলা শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করারও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ইতোমধ্যে বিহার প্রাঙ্গণে গড়ে উঠছে কারুশিল্প, হস্তশিল্প, প্রসাধনী, মিষ্টান্ন ও মৌসুমি ফলের নানা দোকান। অতীতে মাসব্যাপী চলা এ মেলা বর্তমানে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত হলেও এর ঐতিহ্য ও আবেদন অটুট রয়েছে। সর্বোপরি, মহামুনি মেলা বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এক অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

