বান্দরবান জেলার লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যখন চিকিৎসক, নার্স ও জনবল সংকটে ভূগছিল। ঠিক তখনিই সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১ জন আউটসোসিং স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে কিছুটা হলেও স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ। যোগদানের পর প্রথম ১ বছরের বেতন ভাতা পরিশোধ করা হলেও ফের গত ১ বছর ধরে এসব আউটসোর্সিং কর্মীরা নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে আসলেও বেতন পাচ্ছেন না। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে কর্মীরা হতাশার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। দ্রুত চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি ও বেতন ছাড়ে বান্দরবান সিভিল সার্জনের কার্যকরী পদক্ষেপ কামনা করেন ভুক্তভোগী আউটসোর্সিং স্বাস্থ্য কর্মীরা।
এদিকে বান্দরবান সিভিল সার্জনের গাফিলতির কারণে কর্মীদের চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি ও বেতন ছাড়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে জানান, কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্টান ‘ওয়ার্ল্ড সিকিউরিটি লিমিটেড’ বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার এরিয়া ম্যানেজার রুবেল চাকমা। তিনি বলেন, মেয়াদউত্তীর্ণের সাথে সাথে পুণরায় আউটসোর্সিং কর্মীদের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য বিধিমোতাবেক বান্দরবান সিভিল সার্জন বরাবরে আবেদন করেছি, বেশ কয়েকবার যোগাযোগও করেছি। কিন্তু তার কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতির কারণে আজও কর্মীদের চাকুরীরর মেয়াদ বৃদ্ধি হচ্ছেনা, আর এ কারনে দীর্ঘ এক বছর বকেয়া বেতনও ছাড় হচ্ছেনা। অথচ কর্মীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরলস শ্রম দিয়ে আসছেন। তাই কর্মীদের চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি ও বেতন ছাড়ের বিষয়ে সহযোগিতা না করলে আমরা সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চতুর্থ শ্রেণির জনবল সংকটের কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১ জনকে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র অনুযায়ী এ কাজ পায় ‘ওয়ার্ল্ড সিকিউরিটি লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নিয়োগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ড বয় পদে ৩ জন, ওটি বয় ১ জন, আয়া ১ জন, সুইপার ১ জন, নৈশপ্রহরী ১ জন, ল্যাব এটেনডেন্স ১ জন, কুকার ১ জন, ইমারজেন্সি এটেনডেন্স ১ জন ও ১ জনকে স্টেচার বেয়ারার পদে পদায়ন করা হয়। ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল আউটসোর্সিং কর্মীরা যোগদান করেন। নিয়মিত কাজ করে চললেও ১ বছর বেতন বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে অনেক আবেদন নিবেদনের পর ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে বকেয়া ১ বছরের বেতন পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এরপর খেকে আবারো বেতন ভাতা ছাড়ে জটিলতা দেখা দেয়। এতে স্বাস্থ্য কর্মীদের ফের ১ বছরের বেতন ভাতা বন্ধ হয়ে যায়। এ এক বছর ধার করে চলেছেন, এখন আর কেউ ধারও দিচ্ছেন না। এতে হতাশার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে, কারন এই চাকরির ওপর নির্ভর করেই সংসার চলে বলে জানান, ভুক্তভোগী আউটসোর্সিং কর্মী অংথোয়াইচিং মার্মা, রত্না মল্লিক, থোয়াইচ প্রু মার্মা, উক্যসিং মার্মা, রুমা বড়ুয়া, রত্না মজুমদার ও মিমিনু মার্মা। তারা আরো বলেন, দ্রুত বেতন ভাতা ছাড় করা না হলে, কঠোর জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। তবে নিয়মিত ডিউটি পালন করলেও কর্মীদের মেযাদউত্তীর্ণ হওয়ায় বেতন ছাড়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে জানান, লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা নাদিম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ এক বছর পরেও বেতন ছাড়ের কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না হওয়ায় গত ১৬ মার্চ উপজেলার আউটসোর্সিং কর্মীরা বেতন ভাতা ছাড়ের জন্য বান্দরবান সিভিল সার্জন বরাবরে আবেদন করেন। অথচ আবেদনের ১৬-১৭দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত বেতন ভাতা ছাড় করা হয়নি। বেতন ভাতা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আউটসোর্সিং কর্মী পুরু জান্নাত, রাবেয়া বেগম, ও আসমাউল হোসনা লুৎফা বলেন, আমরা গরিব মানুষ, গত এক বছর ধরে বেতন নেই, অথচ আমাদের কাজ এক দিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি। কর্তৃপক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করছেন, আর আমরা অনাহারে অর্ধাহারে দিন পার করছি। তারা আরও জানায়, হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার মতো জরুরি কাজে তারা দিন-রাত নিরলস শ্রম দিচ্ছেন। বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তারা ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। এমনকি গত ঈদ উল ফিতরের আনন্দ ভোগ করতে পারেননি বলে জানান ভুক্তভোগী স্বাস্থ্য কর্মীরা। সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের চিকিৎসা খরচ মেলাতে না পেরে তারা এখন দিশেহারা।
এ বিষয়ে বান্দরবান সিভিল সার্জন মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, প্রাথমিকভাবে আউটসোর্সিং কর্মীদের ৬ মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তায় মেয়াদউত্তীর্ণ হওয়ার পর বেতন ছাড়ে জটিলতা দেখা দেয়। তবুও কর্মীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে মানবিক দিক বিবেচনা করে চাকুরীর মেয়াদ বৃদ্ধি ও বকেয়া বেতন ছাড়ের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি আলোচনা চলছে, কোন ধরণের গাফিলতি করা হচ্ছেনা।
লামায় শ্রম দিলেও এক বছর ধরে বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন ১১ আউটসোর্সিং স্বাস্থ্যকর্মীর
মো. নুরুল করিম আরমান, লামা (বান্দরবান)

