বছর ঘুরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এলে দেশে শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়। কিন্তু পার্বত্য বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার বেশিরভাগ বিদ্যালয়গুলোতে শহীদ মিনার না থাকায় শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়ে শহীদদের যথাযথ স্মরণ করতে পারছেনা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর অদ্যাবদি উপজেলার ১২৭টির মধ্যে ১৩টিতে থাকলেও ১১৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো শহীদ মিনার স্থাপিত হয়নি। এ কারণে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা দেশ মাতৃকার টানে ভাষা দিবসে সকল বীর সেনানীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের যথাযথভাবে সুযোগ পাচ্ছেনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনার থাকলে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা সহজে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পেত বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের দাবী তুলেছেন শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয়রা।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, লামা উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় ৩টি কলেজ, ৮৫টি সরকারি প্রাথমিক, ৪টি রেজি: প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫টি কিন্ডার গার্টেন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ১৪টি। এছাড়া বেসরকারি বিদ্যালয় ও মাদরাসাসহ মিলিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে অন্তত ১৯টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ১৩ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। অপরদিকে উপজেলায় আড়াই লাখের বেশি মানুষের বসবাস। তথ্য প্রযুক্তির অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশের মতো এ উপজেলাও এখন প্রযুক্তিখাতে অনেকাংশে এগিয়ে গেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি সাধন হয়েছে আগের চেয়ে অনেকগুণ। শুধুমাত্র পিছিয়ে রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার স্থাপনের ক্ষেত্রে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লামা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারী মাতামুহুরী কলেজ, কোয়ান্টাম কসমো স্কুল এন্ড কলেজ, চাম্বি স্কুল এন্ড কলেজ, চাম্বি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডলুছড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, লামামুখ উচচ বিদ্যালয়, গজালিয়া উচচ বিদ্যালয়, মেরাখোলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ধুইল্যাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রুপসীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩নং রিপুজিপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফাইতং উচ্চ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে। বাকি ১১৪ প্রতিষ্ঠানে এখনো নির্মাণ করা হয়নি শহীদ মিনার। ফলে ওইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ভাষা দিবসের মত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপজেলা সদরের বা ইউনিয়ন সদরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে এসে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না বানিয়ে শুধু আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল ও প্রভাত ফেরী করেই দিবসটি পালন করা হয়। তবে গত বছর আগে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয় বলে জানান, ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. জাকের হোসেন মজুমদার। স্থায়ীভাবে কোন শহীদ মিনার না থাকায় প্রতি বছর ভাষা দিবসে অস্থায়ীভাবে বাঁশ কাঠ দিয়ে নিজেরা শহীদ মিনার তৈরি করে বিদ্যালয়গুলোতে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হয় বলে জানান, রুপসীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ আলম। তিনি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের জোর দাবী জানান।
সরজমিন নুনারবিল মডেল, রাজবাড়ী, লামামুখ, ছাগল খাইয়া, লাইনঝিরি, কলিঙ্গাবিল পাড়া ও সাবেক বিলছড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শহীদ মিনার নেই। প্রধান শিক্ষক জাহেদ সরোয়ার বলেন, সরকারীভাবে কোন বরাদ্দ না থাকায় শহীদ মিনার নির্মাণ করা যায়নি। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি এলে লামা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারেই শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয়। অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়দর্শী বড়ুয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ দেয়া হলেও শহীদ মিনার নির্মাণে কোন বরাদ্দ দেয়া হয়না। তাই শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারী ভাবে বরাদ্দ প্রদানের জোর দাবী জানান তিনি।
লামা স্বপ্নকানন বিদ্যাপিঠের শিক্ষার্থরা বলেন, গেল ২১ ফেব্রুয়ারী ভাষা দিবসে আমরাদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি করে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদ করেছি। স্থায়ীভাবে একিিট শহীদ মিনার থাকলে ভালো হত। অপরদিকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ক্রংতং পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা জানায়, বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার না থাকায় দিবসটি পালনে ব্যঘাত ঘটেছে।
এ বিষযে লামা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ মাহাবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনার না থাকার ব্যাপারটি জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্য।
১২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০টিতে শহীদ মিনার থাকার সত্যতা নিশ্চিত করে লামা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, শহীদ মিনার নির্মাণ করার জন্য সরকারিভাবে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায় না। তবে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই সেসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ, পৌরসভাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এদিকে লামা উপজেলা পরিষদ প্রশাসক ও নির্বাহী অফিসার মো. মঈন উদ্দিন বলেন, প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার অর্জন-ইতিহাস উপস্থাপন করার জন্য অবশ্যই শহীদ মিনার জরুরি। সেক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লামায় ১২৭টির মধ্যে ১১৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নেই শহীদ মিনার, ভাষা দিবস পালনে যথাযথ সুযোগ পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা
মো. নুরুল করিম আরমান, লামা (বান্দরবান)

