বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

দুর্গাপূজা ও তাঁর দশভুজার স্বরূপ

বাসুদেব খাস্তগীর
- Advertisement -
Single page 1st Paragraph

দুর্গাপূজার আমেজ শুরু হয় মহালয়া উদযাপনের মধ্য দিয়ে। চারিদিকে সাজ সাজ রব। এ এক ভিন্ন আনন্দের উপলব্ধি। প্রতিবছর দুর্গাপূজা আসে মহাসমারোহে। আনন্দ বেদনার অনেক স্মৃতি রেখে আবার চলে যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা নিয়ে কথার ছলে ‘বারো মাসে তের পার্বন’ এর কথা বলা হলেও দুর্গাপূজার মত এত আবেগ উচ্ছ্বাস নিয়ে আর কোনো পূজা আসে না। সেজন্য দুর্গাপূজা আবাল বৃদ্ধবনিতা সকলের কাছে ভিন্ন এক আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। দেবী দুর্গা হচ্ছে এ পূজার প্রধান আকর্ষণ। এই দেবী দুর্গাকে নিয়ে আছে অনেক পৌরাণিক গল্প। সেই গল্প থেকে আমাদের অনেক কিছু জানার এবং শেখার আছে। পুরাকালে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুর্গম নামের এক অসুরকে হত্যা করেন দেবী দুর্গা। বলা হয় তখন মহাদেব তাঁর নামকরণ করেন দুর্গা। শাস্ত্রে দুর্গার আরো একশত আটটি নাম রয়েছে। এই দুর্গাই পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী মহিষাসুররূপী পাপী ব্যক্তিদের বিনাশ করতে প্রতিবছর দেবীপক্ষে ধরাধামে নেমে আসেন।

পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পুরাণ মতে বলা হয়, মহিষাসুরকে বধে দেবী দুর্গার শক্তিকে পৃথিবীতে অধিষ্ঠিত করতে সকল দেবতা ধ্যানমগ্ন হয়ে দুর্গাদেবীর আরাধনায় দেবী সাড়া দিলে দেবতারা একে একে নিজের অস্ত্র তুলে দেন দেবীর হাতে। মূলত রূপক অর্থে সকল দেবতার অস্ত্রই হলো তাঁদের সঞ্চিত জ্ঞানের প্রতীক। এজন্য দেবী দুর্গাকে দশভুজা নামেও অভিহিত করা হয়। দশভুজা মানে দশটি হাত। এ দশটি হাত রূপক অর্থে। এই দুর্গা হচ্ছে মহামায়া রূপী একজন নারীর প্রতিচ্ছবি। একজন নারীকে ঘরে বাইরে অনেক কাজ সামলাতে হয়। নারীর কাজ বহুমুখী। এজন্য কথার ছলে একজন কর্মঠ বা কাজ পাগল নারীকে দশভুজা বিশেষণে ভূষিত করতেও দেখা যায়। দুর্গার দশহাত তাঁর প্রতীকী রূপ। দেখা যায় দশ হাতে তাঁর দশটি অস্ত্র রয়েছে। দশ হাতে তিনি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র বহন করেন। এই দশটি অস্ত্র নিয়ে তিনি প্রবল পরাক্রমশালী অসুরকে বধ করেন। অসুর হচ্ছে অশুভ শক্তির প্রতীক। সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বিঘœকারী এক অপশক্তির নাম অসুর। পৌরাণিক কাহিনি মতে দুর্গার হাতে এই অস্ত্রগুলো একধরনের তাৎপর্য বহন করে। প্রশ্ন আসতে পারে কে এ দশটি অস্ত্র দুর্গার হাতে তুলে দিয়েছিলেন? অস্ত্র পেয়ে দুর্গা হয়ে উঠেছিলেন অশুভ বিনাশকারী এক মহাশক্তি। পৌরাণিক কাহিনিতে বর্ণিত আছে স্বর্গে মহিষাসুর নামে এক প্রবল পরাক্রমশালী অসুরের অত্যাচারে যখন দেবতারা স্বর্গলোক ত্যাগ করতে বাধ্য হন, তখন স্বর্গের দেবতারা এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে দেবী দুর্গার আশ্রিত হন। কথিত আছে ব্রহ্মার বরে কেবলমাত্র কোনো নারীই তাকে একমাত্র বধ করতে পারেন। এমন তথ্যে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের মিলিত তেজে সৃষ্টি হয়েছিল মহামায়া দুর্গার। তখন দেবতারা নিজেদের অস্ত্রগুলি দুর্গার হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে সংহাররূপিনী বা মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে সজ্জিত করে। তার রুদ্র রূপের কাছে সবাই তটস্থ। তাঁর দশ হাতে যে দশটি আছে তারও একটি পৌরাণিক ব্যাখা আছে। তাঁর দশহাত দশটি দিক বা দশটি শক্তির প্রতীক। দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্রগুলো হচ্ছে চক্র, ত্রিশূল, শঙ্খ, বজ্র, গদা, তীর-ধনুক, তলোয়ার, ঘণ্টা, পদ্ম ও সাপ। কথিত আছে এ অস্ত্রগুলো দশজন দেবতা দুর্গাকে তার দশহাতে তুলে দিয়েছিলেন। দেবীর হাতে যে বিভিন্ন অস্ত্র শোভা পায় তার মধ্যে চক্র তা দিয়েছিলেন বিষ্ণু। এই অস্ত্র দৃঢ়তা এবং সংহতির প্রতীক বলে মনে করা হয়। দেবী দুর্গার হাতে চক্র থাকার অর্থ হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টির কেন্দ্রে অবস্থান করছেন স্বয়ং দেবী দুর্গা। দুর্গাকে ত্রিশূল দান করেছিলেন স্বয়ং মহাদেব। কথিত আছে ত্রিশূলের যে তিনটি ফলা তার আলাদা আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। বলা হয় মানুষের তিনটি গুণ-সত্য, তমঃ, রজঃ এর প্রতীক ত্রিশূলের তিন ফলা। সত্য একটি গুণ যা চিন্তা, বাক্য ও কর্মে সত্যবাদী হওয়াকেই বোঝায়, যা হিন্দু ধর্ম ও দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। তমঃ শব্দের অর্থ হলো অন্ধকার। হিন্দু দর্শনে এটি প্রকৃতির তিনটি গুণের মধ্যে একটি, যা তমোগুণ নামে পরিচিত এবং এর অর্থ অন্ধকার বা অজ্ঞানতা। রজঃ হচ্ছে হিন্দু দর্শন অনুসারে এটি প্রকৃতির তিনটি গুণের মধ্যে একটি, যা গতি ও কার্যকলাপের প্রতীক। দুর্গার যে মূর্তি আমরা দেখি তাতে দেখা যায় এই ত্রিশূল দিয়েই তিনি মহিষাসুরকে বধ করেন। দুর্গার এক হাতে থাকে শঙ্খ। দেবতা বরুণ দেব দুর্গাকে দিয়েছিলেন শঙ্খ। বলা হয় শঙ্খের ধ্বনি মঙ্গলময়। বিশ্বাস করা হয় শঙ্খের ধ্বনিতে স্বর্গ, মর্ত্য ও নরক জুড়ে থাকা সব অশুভ শক্তি ভীত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্গা দেবীর হাতে বজ্র তুলে দিয়েছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। বজ্রের থেকে আরও একটি বজ্র সৃষ্টি করে তা দুর্গার হাতে তুলে দেন দেবরাজ ইন্দ্র। এটি দুর্গার হাতের দৃঢ়তা এবং সংহতির প্রতীক। দশভুজা দুর্গার একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হল গদা। যমরাজ দেবী দুর্গার হাতে তুলে দিয়েছিলেন আনুগত্য, ভালবাসা, ভক্তি ও শক্তির প্রতীক গদা। অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় তীর-ধনুক ব্যবহার করেন দুর্গা। দেবতা পবন দেবী দুর্গাকে দেন তীর-ধনুক। যা প্রচ- শক্তির প্রতীক। বুদ্ধি বা ধারের প্রতীক হচ্ছে তলোয়ার। তলোয়ারের ধার দিয়েই সমাজের সমস্ত বৈষম্য ও অশুভকে বিনাশ করা যায়, সেই বার্তাই বহন করে মা দুর্গার হাতের তলোয়ার। গণেশ স্বয়ং এই তলোয়ারটি দুর্গাকে দিয়েছিলেন, যা বুদ্ধি ও অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। দুর্গাকে পদ্ম দান করেছিলেন ব্রহ্মা। এই পদ্ম শুধু দুর্গা মায়ের হাতে নয়, পুজোর কাজেও ব্যবহার করা হয়। দুর্গার হাতের এই পদ্ম ফুল জ্ঞান ও মুক্তির প্রতীক। ঘন্টার ধ্বনিতে সমস্ত জগৎ থেকে অশুভ শক্তির বিনাশ হয়। ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত দুর্গাকে ঘণ্টা দান করেছিলেন।

লক্ষ্য করলে দেখা যায় মা দুর্গার এক হাতে একটি সাপ জড়িয়ে থাকে, যাকে বলা হয় নাগপাশ, যা চেতনার প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়। শেষনাগ দেবী দুর্গাকে দিয়েছিলেন এই নাগপাশ৷ শুদ্ধ চেতনার প্রতীক হল এই সাপ। দশ হাতে দুর্গা শক্তির প্রতীক হিসাবে আমাদের কাছে আসেন- এজন্য দেবী দুর্গার আরেক নাম দশভুজা। বিশ্বাস করা হয় দশ হাতের দশ অস্ত্রের সর্বশক্তি দিয়ে দেবী দুর্গা দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করে জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করেন। পৃথিবীতে যখন ধর্ম আর অধর্মের লড়াই শুরু হয় তখন এই শান্ত ও শক্তির প্রতীক দুর্গারূপ ধারণ করে অধর্মকে বিনাশ করেন। তাই জগতে শান্তির জন্যই দেবী দুর্গা পূজিত হয়। পুরাণ থেকে জানা যায় দেবীর বাহন রূপে সিংহকে দান করেছিলেন গিরিরাজ হিমালয়। অসুর নিধনে এই সিংহ-ই দুর্গার বাহন হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। দশভুজার পাশাপাশি দুর্গাকে ত্রিনয়নীও বলা হয়। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পুরাণে বলা হয়েছে, দেবীর তিনটি চোখের বাম চোখ বাসনা বা চন্দ্রের প্রতীক। ডান চোখ কর্ম বা সূর্যের প্রতীক। আর কপালের কেন্দ্রীয় চোখ জ্ঞান বা অগ্নির প্রতীক। দুর্গার এই বহুমুখী দিক রূপক অর্থে অনেক গুরত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। উৎসবপ্রেমী সনাতনী বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব এই দুর্গাপূজা। এই আনন্দে সামিল হয় সকলেই। বছরের নতুন পঞ্জিকা হাতে নিয়েই সকলে সবার আগে চোখ রাখেন দুর্গাপূজা সময় বা তার দিনক্ষণের দিকে। সারা বিশ্বের সনাতনধর্মী বাঙালিরা জাকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করেন এই পূজা।

এই বিভাগের সব খবর

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে তথ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ...

সৌরশক্তির জাগরণ: পাকিস্তান যেভাবে নিরবে বিদ্যুৎ সংকট জয় করল

কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের প্রধান সমস্যা ছিল 'লোডশেডিং'। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যেত এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্ধকারে থাকত। তবে...

লামায় নদীতে গোসল করতে নেমে পর্যটক নিখোঁজ

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদীতে নেমে আব্দুল ওয়াদুদ সায়েম (১৮) নামের এক পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে (১৬ এপ্রিল)...

সর্বশেষ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সঙ্গে সৌজন্য...

সৌরশক্তির জাগরণ: পাকিস্তান যেভাবে নিরবে বিদ্যুৎ সংকট জয় করল

কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের প্রধান সমস্যা ছিল...

লামায় নদীতে গোসল করতে নেমে পর্যটক নিখোঁজ

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা মাতামুহুরী...

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার: আইনমন্ত্রী

কার্যক্রম নিষিদ্ধ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে...

আলীকদমে হামের উপসর্গ নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ৬ শিশু, আক্রান্ত পাড়ায় ৪ সদস্য বিশিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর দল

বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাম রোগের...

হালদায় শুরু হয়েছে মা মাছের আনাগোনা

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র জোয়ার ভাটা ও...