বাংলাদেশের গন্ডি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক শিরোনাম হওয়া,দেশ – বিদেশের বিবেকবান মানুষকে রীতিমতো নাড়িয়ে দেয়া মুন্সীগঞ্জ সদর থানাধীন পঞ্চসার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে সুগভীর চক্রান্তের মাধ্যমে পরিকল্পিত ভাবে ধর্ম অবমাননার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে নিরিহ ও সহজ সরল চরিত্রের অধিকারী এই শিক্ষকের অপরাধ হলো,তিনি গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে ভালো শিক্ষাদান করেন। ফলে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে প্রাইভেট কোচিংয়ের ক্ষেত্রে এক নম্বর পছন্দ ছিলেন তিনি।কমপক্ষে ৬০ এর অধিক শিক্ষার্থীকে তিনি টিউশন দিতেন।আরও জনা পঞ্চাশেক শিক্ষার্থী টিউশন নিতে সবসময়ই হৃদয় মন্ডলের নিকট অনুনয় বিনয় করে অপেক্ষায় ছিলো।কিন্তু সময়ের অভাবে নতুন করে কাউকে নিতে পারছিলেননা তিনি।সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের মুক্তি আন্দোলনের তীব্রতা দিনদিন বাড়ছিলো।সূদুর লন্ডন থেকে আবদুল গাফফার চৌধুরী, সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম, বিচারপতি শামসুল হুদা, বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ, অধ্যাপক অনুপম সেন,অধ্যাপক ড. মোঃ জাফর ইকবাল, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, শিল্পী হাসেম খাঁন,রফিকুন নবী( রনবী),সমাজকর্মী মালেকা খাঁন,অধ্যাপিকা পান্না কায়সার, মাহফুজা খানম,ঊষাতন তালুকদার, কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, ঘাদানিক সভাপতি শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন,চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, সালমা হক,শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ, শিল্পী আবুল বারক আলভি, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল সহ দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী মহলের গুটিকয়েক বাদে (যেমন আসিফ নজরুল) প্রায় সকলেই সোচ্চার হয়েছেন হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের মুক্তির দাবীতে। নিকট অতীতে যা বেশ বিরল ঘটনাই বলতে হবে।তাছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্র,বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, নারী মুক্তি কেন্দ্র, মহিলা পরিষদ,উদীচী,সিপিবি, বাসদ,মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট,ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ সহ ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সংগঠন প্রায় রোজই কোন না কোন কর্মসূচী নিয়ে হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের মুক্তির দাবী জানাচ্ছেন। সাপ্তাহিক স্লোগান এর এই প্রতিবেদক দুই দিন সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে সেই ছাত্র (যে মোবাইলে রেকর্ড করছিলো আর উদ্দেশ্যমূলক ভাবে ধর্মীয় প্রশ্ন করে যাচ্ছিলো হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে),স্কুলের প্রধান শিক্ষক, স্থানীয় মানুষজন,স্কুলের ছাত্র ছাত্রী, অন্য শিক্ষক, হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের স্ত্রী, মামলার বাদী,স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা,সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত), মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের হয়ে মামলায় লড়াই করা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সতীর্থ আরেকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে,এবং সকলের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ হিসেবে এটাই প্রতীয়মান হয় যে,স্থানীয় কোচিং সেন্টার খোলা কিছু সাবেক ছাত্র শিক্ষক, হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের নিকট টিউশন নিতে চেয়ে ব্যর্থ হওয়া কয়েকজন ক্ষুব্ধ ছাত্র, এমনকি ধর্মীয় রং চড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে সচেষ্ট কিছু ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টার সফল মঞ্চায়ন হচ্ছে হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের বর্তমান কারাবন্দী ভাগ্যবরণ।সেদিন ক্লাসে অডিও রেকর্ড করা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী(নাম প্রকাশ করবোনা শর্তে তিন ঘন্টার চেষ্টায় সম্মত হয়েছে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে) বলেন,পাঠ্যসূচী অনুযায়ী সেদিন বাংলা দ্বিতীয় পত্রের ক্লাস থাকলেও সেই শিক্ষক না থাকায় হৃদয় চন্দ্র মন্ডল এসেছিলেন। তিনি বিজ্ঞান পড়াচ্ছিলেন।এক পর্যায়ে ধর্ম ও বিজ্ঞান বিষয়ে আলোচনার উদ্রেক হয়।শিক্ষক যখন সেই বিষয়ে কথা বলছিলেন তখন তাঁর এক সহপাঠী তাঁকে অডিও রেকর্ড করতে বলে জানায় সে।স্কুলে মোবাইল ফোন এলাও কিনা জানতে চাইলে এবং সে সবসময়ই স্মার্টফোন নিয়ে ক্লাসে যায় কিনা প্রশ্নে জানায়,না সেদিনই টিফিনের পর সে মোবাইল ক্লাসে নিয়ে গিয়েছিল লুকিয়ে। একই ক্লাসে তাঁর এক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানায়,স্যারকে সেদিন ইচ্ছা করেই ঐ ছাত্র বারবার ধর্মীয় বিষয় টেনে আনছিলো,আর নিজের ইচ্ছাতেই সে তা রেকর্ড করেছে।সেদিন স্যার কি বলেছিলেন প্রশ্নে এই ছাত্র জানায়,স্যার বলেছিলেন ধর্ম হলো বিশ্বাস আর বিজ্ঞান হলো প্রমান ভিত্তিক জ্ঞান। রেকর্ড করা ছাত্রের ভাষ্যমতে, আন্দোলনের দিন তাঁর বন্ধু ও বহিরাগত কয়েকজন তাঁকে নিয়ে যায়। সে নিজে এই পরিকল্পনার অংশ কিনা প্রশ্নে নিরব থাকে। একসময় তাঁর অভিভাবক সরিয়ে নেয় তাঁকে।কথা হয় স্কুলের আশেপাশের এলাকায় বসবাসরত স্থানীয় মানুষের সাথে।উল্লেখ্য, শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলও স্কুলের একশত গজের ভেতরইবসবাস করেন।স্থানীয় মানুষের ভাষ্যমতে,এই এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতীর ইতিহাস বহুকাল পুরনো।আশেপাশের কয়েকটি গ্রামে প্রগতিশীল চিন্তার ও সংস্কৃতিমনা কয়েকটি প্রজন্মের বসবাস।
এমনকি স্কুলের পরিচালনা কমিটিতেও মুক্তমনা হিসেবে পরিচিত কয়েকজন বিদ্যমান।তবু্ও ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গুজবের মিশ্রন ও কিছু মানুষের অতি উৎসাহী ভূমিকা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।সেই সময় মুক্তমনা হিসেবে পরিচিত কয়েকজন চেষ্টা করেও উত্তেজিত জনতার কাছে টিকতে পারেননি।তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানালে তাঁরা তখন হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিজেরাও পুলিশের আগমন প্রত্যাশায় ছিলেন। হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের আইনজীবী, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অজয় কুমার চক্রবর্তীও একই কথা বলেন।তিনি বলেন, পুলিশ না গেলে হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের জীবন সংশয় ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলের অন্ততঃ তিনজন শিক্ষক, দুজন কর্মচারী ও কয়েকজন ছাত্র ছাত্রী সরাসরি এটা পরিকল্পিত ভাবে করা হয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন এই প্রতিবেদকের নিকট।ঐ শিক্ষকরা আরও বলেন, হৃদয় চন্দ্র মন্ডল গত টানা একুশ বছর ধরে এই স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।তাঁর মতো সহজ সরল ও ভালো মানুষ কমই আছে। অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে কোন ধরনের অভিযোগের রেকর্ড নেই। আর ঐ ঘটনায় প্রথমে কয়েকজন ছাত্র প্রধান শিক্ষকের নিকট অভিযোগ আকারে জানালে প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন আহমেদ তিন দিনের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিলেন।কিন্তু তিনদিন পার হওয়ার আগেই ২২শে মার্চ সহস্রাধিক মানুষ, কিছু শিক্ষার্থী ও বহিরাগত অতি উৎসাহীরা মিছিল করে স্কুলে ঢুকলে প্রধান শিক্ষক বিষয়টি সদর থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান।পরে পুলিশ এসে হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে আটক করে নিয়ে যায়।এরপর স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মোঃ আসাদ বাদী হয়ে ২৯৫ ধারায় মামলা দায়ের করলে সেই মামলায় হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে গ্রেফতার দেখানো হয়।বাদী আসাদ এই প্রতিবেদককে জানান,আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। ছাত্রদের কাছে শুনেছি। কর্তৃপক্ষ আমাকে বাদী হতে বলায় আমি বাদী হয়েছি।কর্তৃপক্ষের কে বলেছে প্রশ্ন করলে আসাদ তা বলতে অস্বীকৃতি জানান।হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের আরেক আইনজীবী এডভোকেট শাহিন মোহাম্মদ বলেন,ধারাটি জামিন অযোগ্য হলেও আদালত চাইলে জামিন দিতে পারেন।এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেনজির আহমেদ বলেন, হৃদয় মন্ডল পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন।ছাত্র ও শিক্ষকদের কথায় এটা স্পষ্ট যে, পরিকল্পিত ভাবে রেকর্ডসহ তা ছড়ানো,আন্দোলন সবকিছু হয়েছে। এর বাইরে বেশি কিছু বলা দায়িত্বশীল পদে থেকে সমিচীন নয় বলেই মনে করি।প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের স্ত্রী ববিতা হাওলাদারের।তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই আমার স্বামীকে রাস্তায় কটুক্তি করা হতো,বাসার সামনে দিয়ে নাম ধরে বাজে কথা বলতো,রাতে গেইটে লাথি মারতো,ঢিল ছুড়তো।
অচেনা ছেলেদের সাথে স্কুলের কয়েকজন ছাত্র যাঁরা টিউশন নিতে চেয়ে পারেনি,তাঁদেরও দেখা যেতো।তিনি ছাত্রদের বুঝিয়ে বলেছেন। আর এভাবেই পাঠদান চালিয়ে গেছেন। উনি জীবনে কারো কোনো ক্ষতি করেননি,তারপরও কেনো ওনাকে এই ভাগ্যবরণ করতে হলো? স্বামী জেলে যাবার পর থেকে সন্তান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলেও মিডিয়ায় ব্যাপক ভাবে এটা আসার পর থেকে নিজেকে আর নিরাপত্তাহীন মনে করেননা বলে সকলের নিকট (মিডিয়া)কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। সেই সাথে আশা প্রকাশ করেন, ১০ ই এপ্রিল শুনানি শেষে আদালত থেকে জামিন পাবেন স্বামী, ফিরতে পারবেন চাকুরীতে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ- পরিদর্শক মিজানুর রহমান জানান,ছাত্ররা হেড মাষ্টারের কাছে যে অভিযোগ করেছে ও আন্দোলন করেছে তা রেকর্ডে পাওয়া যায়নি। সম্ভব দ্রুততম সময়ের ভেতর চার্জশীট দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

