বেলুচিস্তানে জইশ আল-আদলের ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়া,কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন,ইরানের ভূখন্ডে পাল্টা হামলা চালানোর পর আচমকাই বদলে গেলো পরিস্থিতি।যখন মনে হচ্ছিল দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চলেছে,ঠিক তখনই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নরম সুর শোনা গেলো।
দুই দেশ পুনরায় কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ঘোষণাও এলো পাকিস্তানের পক্ষ থেকে।উত্তেজনার পারদ হঠাৎ করে কোন যাদুবলে এতো নীচে নেমে একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেলো,বিবিসি ও রয়টার্স সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সেই কারণ অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে আসল কারণ। ইরানের হামলা এবং তাদের মাটিতে পাকিস্তানের পাল্টা হামলার সময়ে দেশে ছিলেন না পাকিস্তানের অন্তবর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী আনওয়ার।সংঘাতের আবহে তড়িঘড়ি তিনি ফিরে এসেছেন ইসলামাবাদে।দেশে ফিরেই আনওয়ার আগে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনএসসি)-এর সঙ্গে বৈঠক করেন।ইরান সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।নিরাপত্তা বৈঠকে এ বিষয়ে পাক প্রধানমন্ত্রী জওয়ানদের প্রশংসাই করেছেন বলে খবর। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের উপরে হস্তক্ষেপ যে মেনে নেওয়া যাবে না,এ বিষয়ে তাঁরা একমত। বৈঠক শেষে ১৯ জানুয়ারী শুক্রবার আনওয়ার বলেন, পাকিস্তান আইন মেনে চলে,এটি একটি শান্তিপ্রিয় দেশ। ইরানের সঙ্গে ছোটখাটো যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা কথাবার্তার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া যাবে।’তিনি আরও জানান,তাঁর দেশ সমস্ত দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী। বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে পাকিস্তান কখনও সম্পর্ক তিক্ত করতে চায় না।
পশ্চিমের পড়শি দেশ ইরানকে ‘ভাইয়ের মতো’ বলে উল্লেখ করেছেন আনওয়ার।দুই দেশের সুসম্পর্কের দৃষ্টান্ত দিয়ে অতীতের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়,জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলর বৈঠকে বেশকিছু বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেন।তন্মধ্যে বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান,পাকিস্তানের অর্থনীতির বাস্তবতা,বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আর বিশেষ করে বৈঠক চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান সীমান্ত এলাকায় ইরানের বিশাল সৈন্য বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতীর মহড়া শুরু করার খবর পৌঁছে যাওয়া।এসকল বিষয় মিলিয়েই সুর নরম করে শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের মোট ভূমির প্রায় ৪৪% বেলুচিস্তানে।তবে দেশটির মোট জনসংখ্যার (২৪.১ কোটি) মাত্র ৬% বাস করে ঐ অঞ্চলে।বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী প্রদেশ হলেও দেশটির অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় এটি সবচেয়ে কম উন্নত। বেলুচিস্তান বলতে আসলে যে অঞ্চলটিকে বোঝানো হয় তা পাকিস্তানের সীমানার বাইরেও ছড়ানো।পাকিস্তানের বাইরে আফগানিস্তান আর ইরানেও বেলুচিস্তানের কিছু অংশ রয়েছে।
আর পাকিস্তান আর ইরানের মধ্যে যে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে,তার দু’টি হামলার ঘটনাই ঘটেছে বেলুচিস্তান অঞ্চলে।গত ১৬ জানুয়ারী মঙ্গলবার ইরানের মিসাইল হামলাটি হয় পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের বেলুচিস্তান এলাকায়।আর ১৮ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার পাকিস্তান যে পাল্টা হামলাটি করে ইরানের ভূখন্ডে,সেটিও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সিস্তান-বালুচিস্তান অঞ্চলে। পাকিস্তানের অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় বেলুচিস্তানের ভৌগলিক.ঐতিহাসিক ও সেখানকার মানুষের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য আলাদা।ইরান ছাড়াও তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের সাথে সীমানা রয়েছে বালোচিস্তান অঞ্চলে।এই এলাকায় আরব সাগর সংলগ্ন উপকূলও রয়েছে।শত শত বছর ধরে স্থানীয় বালুচ জাতির মানুষের বসবাস হওয়ার কারণে এই অঞ্চল বালুচিস্তান নামে পরিচিত।বালুচরা ছাড়াও এখানে পাশতুন সহ আরও অন্য জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ইরানের মহড়ায় পাকিস্তান বুঝতে পেরেছিলো,আবার হামলা করবে তাঁরা।আর চলমান বৈশ্বিক ও নিজেদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় যুদ্ধে জড়িয়ে ক্ষতি ছাড়া লাভ হবেনা।অন্তরালে ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনেরও চাপ ছিলো শান্তি ফিরিয়ে আনার।সবকিছু মিলিয়ে পাকিস্তান শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। পাকিস্তান আলোচনার মাধ্যমে সব বিষয়ের সমাধানের আগ্রহ প্রকাশ করে শুক্রবার।দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে ফোনালাপের সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রস্তাব তোলেন।দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপের পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়: “দ্বিপাক্ষিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতে ইরানের সাথে সব বিষয়ে কাজ করার জন্য পাকিস্তানের আগ্রহের বিষয়টি ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিলানি। তারা পরিস্থিতি স্তিমিত করার বিষয়েও রাজি হন।দুই দেশের রাষ্ট্রদূতরা যেন অপর দেশের রাজধানীতে তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারেন,সে বিষয়টিও আলোচনা হয়েছে। আজ ২০ জানুয়ারী দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পাকিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার-উল-হক কাকারের কার্যালয়।পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় দুই দেশের রাষ্ট্রদূতই তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিলেও ইরানের পক্ষ থেকে এখনও কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। সূত্র:- বিবিসি,রয়টার্স ও আল-জাজিরা।
