সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, বিস্ফোরক ও মাদক শনাক্তে কুকুরের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। বাংলাদেশেও প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে অহরহ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি) প্রথমবারের মতো যুক্ত হলো-‘ডগ স্কোয়াড’।
রোববার (২১ ডিসেম্বর) দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্কোয়াডের উদ্বোধন করেন সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়।
সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই ডগ স্কোয়াডে আছে নয়টি কুকুর। নেদারল্যান্ডস থেকে আনা এই কুকুরগুলোর মধ্যে চারটি বিস্ফোরক ও পাঁচটি মাদক শনাক্তে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে জানিয়েছেন পুলিশের কর্মকর্তারা।
প্রায় এক দশক আগ থেকে সিএমপিতে ডগ স্কোয়াড আনার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। ২০১৪ সালে সিএমপির সাবেক কমিশনার আব্দুল জলিল মণ্ডলের সময়ে ডগ স্কোয়াড গঠনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর আরও কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ফলপ্রসূ হয়নি।
তবে আলোচনা গতি পায় ২০২১ সালে এসে। ওই বছরের ১৯ ডিসেম্বর পুলিশ সদরদপ্তরে সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) সানা শামীমুর রহমানের সই করা এক চিঠিতে আট কারণে ডগ স্কোয়াড গঠন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ছিল- চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা, ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিস্ফোরক শনাক্ত করা, তারকাবিশিষ্ট হোটেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্টেডিয়াম, আন্তর্জাতিক ইভেন্ট ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কুকুর দিয়ে বিস্ফোরক-মাদক শনাক্তের যুগে সিএমপি
সেই প্রস্তাবে নতুন কে-৯ ইউনিটকে (ডগ স্কোয়াড) সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম (সিটি) বিভাগের অধীনে গঠন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়। এর জন্য সিএমপি দুটি ভিন্ন প্রজাতির ২০টি প্রশিক্ষিত কুকুর চেয়েছিল, যার মধ্যে আটটি ছিল জার্মান শেফার্ড। প্রস্তাবে জনবল হিসাবে ইউনিট পরিচালনার জন্য ৩৮ পুলিশসহ মোট ৪০ কর্মচারীর প্রয়োজন হবে বলে জানানো হয়।
সেই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে প্রশিক্ষিত কুকুরগুলো নেদারল্যান্ডস থেকে আনা হয়। পাশাপাশি ২৭ জন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়। গত বছর নেদারল্যান্ডস থেকে কুকুরের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার ওপর ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ নেন সিএমপির আট সদস্য। পাশাপাশি আরও ১৯ জন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। কুকুরগুলো এতদিন ডিএমপিতে যুক্ত ছিল। গত ২০ ডিসেম্বর নয়টি কুকুর সিএমপিতে পাঠানো হয়।
আগের আট কারণের সঙ্গে ডগ স্কোয়াডের গঠনের পেছনে নতুন করে আরও দুটি কারণ যুক্ত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামে চালু হওয়া শেখ মুজিবুর রহমান টানেল এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের নিরাপত্তা তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। কেননা চট্টগ্রাম নগরী মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। প্রায়সময়ই উদ্ধার ও জব্দ করা হয় আইস, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক। এছাড়াও, জঙ্গিবাদের ঘটনা এই নগরে নতুন নয়। আর বাসস্টপ, রেল স্টেশন ও বিমানবন্দরে যানবাহন ও ব্যাগে গণহারে তল্লাশির বিষয় থাকে।
এক্ষেত্রে একজন মানুষ বা একটি যন্ত্র দিয়ে পুরো যানবাহন বা বিশাল এলাকা তল্লাশি করা বা সন্দেহভাজনের ব্যাগের সব মালপত্র দেখা সময়সাপেক্ষ ও চ্যালেঞ্জিং। অনেক ক্ষেত্রে আবার তল্লাশির সময় পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ উঠে। লুকিয়ে রাখা বিস্ফোরক কিংবা মাদক খুঁজে বের করতে বা জঙ্গি আস্তানায় বোম ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা যেখানে পৌঁছাতে পারেন না, সে সব জায়গায় তল্লাশির জন্য দ্রুততম সময়ে কাজ করতে সক্ষম এই বিশেষ কে-নাইন বা ডগ স্কোয়াড।
সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, সিএমপি কে-নাইন ইউনিটে বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৮ পুলিশ সদস্য যুক্ত করা হয়েছে। এই ইউনিটের প্রধান হিসেবে থাকবেন কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগের এক সহকারী কমিশনার। এই ইউনিটের অধীনেই পরিচালিত হবে ডগ স্কোয়াড। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে এই ডগ স্কোয়াড মূলত মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধারে কাজ করবে।
সিএমপি’র মনসুরাবাদ পুলিশ লাইনে ডগ স্কোয়াডের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১০টি ক্যানেল সমৃদ্ধ একটি আধুনিক দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে রয়েছে ডগের পরিচর্যা কেন্দ্র, গ্রুমিং স্পেস, রান্না ঘর, শাওয়ারের ব্যবস্থা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য উন্মুক্ত মাঠ ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কাঠামো।
উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘সিএমপিতে ডগ স্কোয়াড সংযোজনের মাধ্যমে সিএমপির অপরাধ দমন সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেল।’ তিনি এ সময় সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনে শহিদ পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগের কথা গভীরভাবে স্মরণ করেন।

