বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

বঙ্গবন্ধু টানেল : আজ স্বপ্নের দুয়ার খুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী

- Advertisement -
Single page 1st Paragraph

একদিকে নিজেদের টাকায় নির্মিত পদ্মা সেতু বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অন্যদিকে ঢাকার ব্যস্ত নগরীতে যানজট থেকে রেহাই দিতে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এবার অপেক্ষা চট্টগ্রামবাসীর। আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে টানেলের যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। যা কিনা দেশে প্রথমবারের মতো কোনো নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম টানেল। পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ দেশের যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে এটি রাখবে অভূতপূর্ব ভূমিকা। পাল্টে যাবে বন্দরনগরীখ্যাত চট্টগ্রাম। সংশ্লিষ্টদের মতে, বঙ্গবন্ধু টানেল চালু হলে চট্টগ্রামের পর্যটনে যোগ হবে নতুন মাত্রা। চীনের সাংহাইয়ের মতো ইকোনমিক জোনসহ শিল্পকারখানায় অঞ্চলটি সমৃদ্ধ হয়ে বদলে যাবে দেশের অর্থনীতি। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থায় আসবে আমূল পরিবর্তন। এ ছাড়াও তৈরি হবে নতুন নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা।

টানেলটি দেশের অন্য অংশের সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর এবং ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর’ মধ্যে সংযোগ হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে জাপানসহ বিভিন্ন দেশ চট্টগ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে লক্ষ্য করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। কর্ণফুলীর অপর পারে নগরায়নের পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গড়ে উঠবে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান যা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।” প্রকল্পের সুফল পেতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।
“মিরসরাইয়ে দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তুলতে কর্ণফুলীর দুই পাড়ের মধ্যে বিকল্প সংযোগের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করে এই টানেল বাস্তবায়ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।”

এদিকে টানেল নির্মাণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সেতু মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুভাগে ভাগ করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অপর ভাগে রয়েছে ভারী শিল্প এলাকা। কর্ণফুলী নদীর ওপর এরই মধ্যে ৩টি সেতু নির্মিত হয়েছে, যা বিদ্যমান বিপুলসংখ্যক যানবাহনের জন্য যথেষ্ট নয়। নদীর মরফলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর তলদেশে পলি জমা একটি বড় সমস্যা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারিতার জন্য বড় হুমকি। এই পলি সমস্যা মোকাবিলায় কর্ণফুলী নদীর ওপর আর কোনো সেতু নির্মাণ না করে এর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা প্রয়োজন।
এ জন্য সরকার জেলার দুই অংশকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই টানেল দিয়ে বছরে ৬৩ লাখ যানবাহন চলাচল করবে। এটি চালুর তিন বছর পর ওই সংখ্যা দাঁড়াবে ৭৬ লাখে। চলাচলকারী গাড়িগুলোর বেশির ভাগ অর্থাৎ ৫১ শতাংশ বাণিজ্যিক কাজ বা পণ্য পরিবহন করবে। টানেল নির্মাণের সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে এ পূর্বাভাস জানা গেছে।

সূত্র জানায়, টানেল সাইটে নদীর প্রস্থ ৭০০ মিটার এবং পানির গভীরতা ৯-১১ মিটার। টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৪০০ মিটার। টানেলের প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা দিচ্ছে। বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা চীন সরকার ব্যয় করছে।
নগরীর পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি সংলগ্ন এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। টানেলটি হচ্ছে দুটি টিউবে চার লেনবিশিষ্ট। এ ছাড়া টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড এবং ৭২৭ মিটার ওভারব্রিজ রয়েছে। চীনের কমিউনিকেশন এবং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) টানেল নির্মাণের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর এই টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই পুরোদমে চলে প্রকল্পের কাজ, আজ হবে উদ্বোধন। টানেলের এক মাথা শুরু হয়েছে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির পাশ থেকে। নদীর তলদেশ দিয়ে তা চলে গেছে আনোয়ারার দিকে। নদীর তলদেশের এই পথের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। আগে এ পথ পেরোতে এক ঘণ্টা সময় লাগত, এখন লাগবে মাত্র পাঁচ মিনিট। এ টানেল ধরে চলে যাওয়া যাবে পর্যটননগরী কক্সবাজার ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত।

এ ছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকায় দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। বাঁশখালীতে হচ্ছে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। মহেশখালীতে হয়েছে এলএনজি স্টেশন। আনোয়ারায় হচ্ছে বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এসব মেগা প্রজেক্টের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু টানেল।
এ বিষয়ে কথা হয় টানেল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. হারুনুর রশীদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যানবাহন চলাচলের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত টানেল। এরই মধ্যে একাধিকবার পরীক্ষামূলক গাড়ি চলাচল করেছে। এখন সাজসজ্জার কাজ চলছে। নিরাপত্তা তথা খুঁটিনাটি বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে। উদ্বোধনের পরদিন ২৯ অক্টোবর থেকে যানবাহন চলাচলের জন্য টানেল উন্মুক্ত করা হবে।’

এদিকে চট্টগ্রামে ৩০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় কিংবা ৯ মাত্রার ভূমিকম্পেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলে হবে নিরাপদ যাত্রা। ফ্লাডগেট থাকায় টানেলে যেমন পানি প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই, তেমনি ২০ মিটারের নিচে ভূমিকম্পে কোনো কম্পন অনুভূত হবে না। বিশ্বমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করে টানেল প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সময় ১০ থেকে ৩০ ফুট এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১২ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। সেই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের ঘটনার সঙ্গে প্রায় পরিচিত চট্টগ্রামবাসী। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি টানেল অবস্থিত হওয়ায় বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাসে পানি ঢুকে কর্ণফুলী টানেল প্লাবিত হতে পারে কি না–এমন প্রশ্ন রয়েছে জনমনে। তবে বিশ্বমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করে টানেল প্রস্তুত হওয়ায় কোনো রকম ঝুঁকির আশঙ্কা নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ জানান, টানেলের দুটি টিউবের দুই প্রান্তেই রয়েছে ফ্লাডগেট। ম্যানুয়ালি ২০ মিনিটের মধ্যেই এসব বন্ধ করা সম্ভব। ফ্লাডগেটটি এমনভাবে প্রস্তুত করা, যা দিয়ে পানি ঢোকার নেই কোনো সুযোগ। প্রকল্প পরিচালকের দাবি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বড় মাত্রার ভূমিকম্পেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল অনেক বেশি নিরাপদ।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক আব্দুল হালিম জানান, টানেলে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে ৮০ মিটার পরপর রয়েছে জরুরি ভিত্তিতে বের হওয়ার ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে টানেলের ৫০০ থেকে ৬০০ মিটারের মধ্যে তিনটি ক্রস প্যাসেজ আছে। যার মাধ্যমে একটি থেকে আরেকটিতে দ্রæত চলে যাওয়া যাবে। বিশ্বমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আধুনিক নির্মাণশৈলী ব্যবহার করেই টানেল প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে বঙ্গবন্ধু টানেলকে কেন্দ্র করে সংযোগ সড়কের দুপাশে গড়ে উঠছে ছোট-বড় শিল্পকারখানা। হুহু করে আশপাশের জায়গার দাম বেড়ে গেছে চার-পাঁচ গুণ। সৃষ্টি হচ্ছে বহু কর্মসংস্থান। স্থানীয়রা জানান, বঙ্গবন্ধু টানেলের কারণে এখানে নতুন নতুন ছোট-বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। এতে অনেক যুবকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। সেই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মানও পরিবর্তন হচ্ছে।

এই বিভাগের সব খবর

প্রচলিত বাজেটের মডেলকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছি : অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, কম সময়ের মধ্যে আমরা বাজেটের মডেলটা একটু পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি। মানে পুরনো বাজেটের সেই ফরমেট থেকে বেরিয়ে...

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্প: ৩২ জন নিহত, আহত ৭০০

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে অন্তত ৩২ জনের প্রাণহানি ও সাত শতাধিক আহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ এ তথ্য জানান। জাতির উদ্দেশে...

বাংলাদেশে এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের যৌথ রূপকার হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা কোম্পানিগুলোকে এশিয়ার পরবর্তী বৃহৎ অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় যৌথ রূপকার হতে বাংলাদেশে তাদের মূল্যশৃঙ্খল সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আজ বাংলাদেশ...

সর্বশেষ

প্রচলিত বাজেটের মডেলকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছি : অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, কম সময়ের মধ্যে...

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্প: ৩২ জন নিহত, আহত ৭০০

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে অন্তত ৩২ জনের...

বাংলাদেশে এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের যৌথ রূপকার হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা কোম্পানিগুলোকে এশিয়ার পরবর্তী বৃহৎ অর্থনৈতিক...

মোরশেদুল আলম কাদেরীর পরিবারের পক্ষ থেকে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে অনুদান

মোরশেদুল আলম কাদেরীর পরিবারের পক্ষ থেকে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম...

বাংলাদেশের জন্য ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন বিশ্বব্যাংকের

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম...

কর্ণফুলীতে অনুমোদনহীন মাছের খাদ্য উৎপাদন করায় জরিমানা

জেলার কর্ণফুলী উপজেলায় অনুমোদনহীন মাছের খাদ্য উৎপাদন করায় মো....