আজ ৬ এপ্রিল সেই মহানায়িকার সুচিত্রা সেনের জন্মদিন। সুচিত্রা সেনের প্রকৃত নাম রমা দাশগুপ্ত। ১৯৩১ সালের আজকের এই দিনে পাবনা সদরে তার জন্ম। পাবনা শহরের বাড়িতে কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা ছিলেন গৃহিণী। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে যান তিনি।
১৯৪৭ সালে যখন রমার বয়স মাত্র ১৬ বছর, তখন তার বিয়ে হয়ে যায়। ওই সময়ের বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সেই ঘর আলো করে আসেন মুনমুন সেন।
বিয়ের পাঁচ বছর পর রমা দাশগুপ্তের চলচ্চিত্র জীবন শুরু হয়। রমা থেকে তিনি হয়ে যান সুচিত্রা সেন। তার অভিনীত সর্বপ্রথম সিনেমাটির নাম ছিল ‘শেষ কোথায়’। অবশ্য সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
সুচিত্রা সেন অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার নাম ‘সাত নম্বর কয়েদী’। এটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৩ সালে। একই বছর তিনি অভিনয় করেন ‘সারে চুয়াত্তর’ সিনেমায়। যেখানে তার বিপরীতে ছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। এই সিনেমাটি তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সেই সঙ্গে উত্তম-সুচিত্রা জুটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।
পরবর্তী বিশ বছরে বাংলা চলচ্চিত্রে রীতিমতো রাজ করেছিলেন উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন। তারা জুটি বেঁধে যতগুলো সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, প্রায় সবগুলোই হয়েছিল সফল। আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ জুটি হয়ে আছেন তারা।
সুচিত্রা সেন কেবল বাংলা সিনেমাই নয়, অভিনয় করেছেন হিন্দি সিনেমাতেও। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দেবদাস’ ছিল তার অভিনীত প্রথম হিন্দি সিনেমা। এতে পার্বতীর চরিত্রে অভিনয় করে বলিউডেও শক্ত জায়গা করে নেন সুচিত্রা।
সুচিত্রা সেন অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলো হলো- ‘আন্ধি’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘সপ্তপদী’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘হারানো সুর’, ‘উত্তর ফাল্গুনি’, ‘সবার উপরে’, ‘দেবদাস’, ‘হার মানা হার’, ‘অগ্নি পরীক্ষা’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘মমতা’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘সাপ মোচন’, ‘পথে হলো দেরি’, ‘শিল্পী’, ‘একটি রাত’, ‘বিপাশা’, ‘ত্রিজামা’ ও ‘সদানন্দের মেলা’ ইত্যাদি।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে সুচিত্রা সেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছিলেন। বাংলা সিনেমার প্রথম অভিনেত্রী হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। সেটা ছিলো তৃতীয় মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মাননা দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে তিনি ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। ২০১২ সালে তাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বঙ্গবিভূষণ সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়া শোনা যায়, সুচিত্রা সেনকে ভারতের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সম্মাননা দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারেও মনোনীত করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করেননি।
দীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর ১৯৭৮ সালে হঠাৎ করেই সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র থেকে অবসর গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি চলে যান একেবারে লোকচক্ষুর অন্তরালে। আত্মগোপণে গিয়ে তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওই অবস্থায়ই ছিলেন। কারো সঙ্গেই দেখা কিংবা যোগাযোগ করেননি এই নায়িকা। যার কারণে সুচিত্রা সেনের এই শেষ জীবন ছিল রহস্যময়। যে রহস্যের জট আজও খোলেনি।
২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন সুচিত্রা সেন। তিনি মৃত্যুর অনেক আগেই সরে গিয়েছিলেন সিনেমার দুনিয়া থেকে। তবু সিনেমার মানুষ, দর্শক তাকে কখনো ভোলেনি। মনের ভেতর গেঁথে রেখে দিয়েছিল সযত্নে। সেই যত্নে ঘাটতি পড়েনি আজও। এখনো সুচিত্রা সেনকে সমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করে সবাই। কেননা যুগে কিংবা শতাব্দীতে নয়, সুচিত্রা সেন তো পুরো ইতিহাসেই একজন মাত্র।

