দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের রীতিমতো নাভিশ্বাস উঠে গেছে।আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। কতোটা বিপাকে পড়েছেন তাঁরা সেটা কিছুটা ধারণা করা যায় খাদ্য অধিদপ্তরের ওএমএস ডিলার পয়েন্টগুলো দেখলেই।ডিলার পয়েন্টগুলো উপচে পড়ছে মানুষে।সকাল দশটায় বিক্রি শুরু হবে,অথচ লাইনের সামনে থাকতে ফজর আদায় করেই চলে এসেছেন।অনেকে শূন্য হাতে ফিরে যান।এমন আরও বহু বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছি, মানুষের মনের ভালো মন্দ প্রতিক্রিয়া শুনেছি।
বরাবরই সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরার নীতির ধারাবাহিকতায় সাপ্তাহিক স্লোগান এর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদক আজ বৃহস্পতিবার(১৮ আগস্ট) সরেজমিনে তিনঘণ্টা অবস্থান করেন নাসিক ১৮নং ওয়ার্ডের আল আমিন নগর ওএমএস ডিলার পয়েন্টে।সকাল নয়টায় সেখানে গিয়ে দেখা যায় আনুমানিক তিন শতাধিক নারী ভীড় করে আছেন রাস্তার পূর্ব পাশে,আর রাস্তার পশ্চিম পাশে শতাধিক পুরুষ দাঁড়িয়ে।বহু কিশোর কিশোরীও হাতে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মহিলারা একে অপরকে চুল পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি নন।সে তুলনায় পুরুষদের লাইন বেশ শৃঙ্খলই দেখা যায়।এমনই সময় মহিলাগণ সমস্বরে চিৎকার ও গালাগাল করে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।ফলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।স্থানীয় একজন বারবার সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও কর্নপাত করছিলেন না কেউ ওতে। উল্টো ডিলারকে চরিত্রহীন বলে তির্যক বাক্যবান ছুঁড়ে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন।যদিও এটাই অনুমিত ছিলো।
কারণ কয়েকজন মহিলা এলেন, চাল ও আটা নিলেন তারপর এই প্রতিবেদক ও ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে অপেক্ষায় থাকা মহিলাদের সামনে দিয়ে চলে গেলেন।বেশ কিছুক্ষন ডিলার পয়েন্টের পাশে দাঁড়িয়ে স্বজনপ্রীতির দৃশ্যায়ন দেখে প্রতিবেদক ছবি তুলতে গেলে একজন ছবি তুলতে বাঁধা দেন।সাংবাদিক পরিচয় দিলে ডিলার পয়েন্টের সকলেই সতর্ক তৎপরতা শুরু করেন।মহিলাগণ নিজেদের
ক্ষোভ জানাতে “ও সাংবাদিক ভাই” বলে তাঁদের কাছে যেতে ডাকছিলেন।
একজন গিয়ে মহিলাদের কাছ থেকে ভোটার আইডির ফটোকপি জমা নিলে মহিলাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।কথা হয় ৬৫ বছর বয়সী ফাতেমা বেগমের সাথে।
তিনি বলেন,গত তিনদিন ধরে সকাল সাতটায় এসে বসে থাকলেও একদিনও তিনি কিছু নিয়ে বাড়ি যেতে পারেননি।বারোটা বাজলেই চাল নেই বলে তাড়িয়ে দেয়।তাঁর কথায় সহমত প্রকাশ করেন অনেক নারী।সাজেদা নামের একজন যিনি আল-আমীন নগরের স্থায়ী বাসিন্দা,তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন,কয়দিন আগেও এতো মানুষ দেখিনি।তেলের(ডিজেল -অকটেন)দাম বাড়ার পর থেকে দিনদিন মানুষের ভীড় বাড়ছে।খলিলুর রহমান (৪৫) বলেন,দোকানে যে মোটা চাল ৪৪ টাকা কেজি দুই আগেও ছিলো, এখন সেটি ৫০ টাকা কেজি।আমার আট সদস্যের পরিবারে রোজ তিন কেজি চাল লাগে।এখান থেকে নিলে ৬০ টাকা
বাঁচে।তাই সকালে নিজের এগারো বছর বয়সী ছেলেকে লাইনে রেখে নিজে অটো নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন।এই রাস্তায় যাত্রী পরিবহন করেন তাই এগারোটায় এসে ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে নিজে দাঁড়ান লাইনে।নারী-পুরুষ সবাই অনুরোধ করছিলেন,সকল সাংবাদিকরা যেনো সরকারকে তাঁদের কষ্টের কথা জানিয়ে নিউজ ছাপে।
ডিলার আঃ হককে প্রশ্ন করলাম,চারজন মহিলাকে নিয়ম বহির্ভূত সুবিধা দেবার সিক্রেটটা কি?
তিনি বলেন,তাঁরা এলাকায় সম্মানিত পরিবারের সদস্য ছিলেন।আর্থিক অবস্থা ভালো নয়।চোখের
লজ্জায় এখানে আসেননা।সকালে তাঁদের আশ্বস্ত করে বলে এসেছিলাম যে ভালো করে বোরকায় মুখ ঢেকে পয়েন্টে আসতে।এক মিনিটও লাইনে দাঁড়াতে হবেনা।তাই আইন সকলের জন্য সমান বলতেই হাই দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,জ্বি, এখন থেকে তাই করবেন।আর স্বজনপ্রীতি করবেন না।
ডিলার পয়েন্টের হিসাব তদারকির দায়িত্বে থাকা খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামকে বারোটার পরে অনেককে ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ
কি জানতে চাইলে তিনি বলেন,বাধ্য হয়েই তা করতে হয়।কারণ প্রতিদিনের জন্য একটি পরিমান নিদৃষ্ট করে দেওয়া আছে।কিছুদিন আগেও কেউ খালি হাতে ফিরে যায়নি।কিন্তু এখন দিনদিন মানুষের ভীড় বাড়ছেই।কিন্তু বরাদ্দ বাড়ছেনা।তবে
আমি ও অন্যরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এটা জানিয়েছি।আশাকরি দুয়েক দিনের মধ্যে বরাদ্দ বৃদ্ধির ঘোষণা আসবে।(১৬ই আগষ্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক করার ব্যবস্থা নেয়া হবে)
কোন অনিয়ম হয় কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন,আপনি খবর নেন।যদি তেমন কিছু কেউ বলতে পারে আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেবো।
স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির একজন মোঃ স্বাধীন মিয়া পয়েন্ট সংলগ্ন কদমতলী ব্রীজের কোনে বোরকা আবৃত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেশকিছু নারীকে দেখিয়ে শহিদুল ইসলাম বলেন,এ মহিলারা ভদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের।লজ্জায় লাইনে দাঁড়াতে পারেনা।নিতান্তই দায়ে পড়ে আসছে।এতেই বুঝে নেন মানুষ কেমন আছে।মিডিয়ার সবাই যদি মানুষের কথা লিখে অবশ্যই সরকার ব্যবস্থা নিবে।
তিনি ও অনেক নারী পুরুষ সবগুলো ডিলার পয়েন্টের বরাদ্দ দ্বিগুণ করা,পয়েন্টের সংখ্যা বাড়ানোর জোর দাবী জানান।
দেশের বিশিষ্টজনরাও মানুষের চলমান দূর্ভোগ লাঘবের তাৎক্ষনিক উপায় হিসেবে এগুলোই পথ সরকারের জন্য বলে বিভিন্ন মিডিয়া, টিভি টক শো গুলোতে বলে আসছেন।
ইমা

