নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৯, শোকে স্তদ্ধ সীতাকুণ্ড

  নিজস্ব প্রতিবেদক |  সোমবার, জুন ৬, ২০২২ |  ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ
       

সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ৯ সদস্যসহ মোট ৪৯ জন নিহত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন উদ্ধার সংশ্লিষ্টরা।

ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুনের ব্যাপকতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্ধার কর্মীরা। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকা থেকে সেনাবাহিনীর অন্তত ২০০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল এসেছে। এছাড়া নৌবাহিনীর একটি চৌকষ দলও অংশ নেয় উদ্ধার তৎপরতায়।

চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ওয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটিলিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনিরা চৌধুরী বলেন, একেতো বাতাসের তীব্র গতি তার ওপর বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ থাকার কারণে আগুন এখনও নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তার ওপর বাতাসটাও বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। কেবলমাত্র সম্পূর্ণ শেষ হলে বোঝা যাবে ভেতরে কি কি রাসায়নিক দ্রব্য আছে। ফায়ারের ছোড়া পানি যেন কেমিক্যালের সাথে মিশে সাগরে না মিশে সেদিকে সতর্ক রয়েছে সেনাবাহিনী।

অন্যদিকে কনটেইনার ডিপোতে ক্যামিকেল মজুদের কোন সুযোগ নেই বলছেন বিস্ফোরক পরিদপ্তর।

চট্টগ্রাম বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরক মজুদের কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া যেভাবে থেমে থেমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে তাতে শুধুমাত্র হাইড্রোজেন পারক্সাইডের কারণে হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। এখানে অন্য আরো কোন দাহ্য পদার্থ থাকার সম্ভাবনা আছে। কাস্টমস কতৃপক্ষ কিভাবে এখানে দাহ্য পদার্থ রাখার অনুমতি দেন। তিনি বলেন, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া দাহ্য পদার্থ ভিতরে ঢোকানোর সুযোগ নেই। অথচ এখানে আমাদের কিছুই অবগত করা হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মফিদুল আলম বলেন, এই রাসায়নিকের বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। এসব রাসায়নিক পদার্থ ফায়ার সার্ভিসের ছোঁড়া পানির সাথে মিশে সাগরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় একটি খালের পানি প্রবাহ বাধ দিয়ে আটকে দিয়েছে সেনাবাহিনীর বিশেষ ইঞ্জিনিয়ারিং টিম। বিস্ফোরণস্থল হতে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে খালের পানি বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়।

শনিবার রাত থেকে রবিবার বিকাল পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, ডিপোর বাইরে শত-শত এ্যাম্বুলেন্স সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শনিবার সারা রাত ধরে কিছুক্ষণ পর-পর দগ্ধ একেকজনকে বের করা হচ্ছে আর তাদেরকে নিয়ে এক একটি এ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে চলছে। প্রতি মুহুর্তে এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যাচ্ছিল। তবে রবিবারের পেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। কিছুক্ষণ পর-পর সাইরেন বাজিয়ে এ্যাম্বুলেন্স ছুটছিল তবে দগ্ধ রোগি নিয়ে নয়। এ্যাম্বুলেন্সগুলো ছুটছিল লাশ নিয়ে। গলিত, অর্ধগলিত কিংবা ছিন্নভিন্ন একেকটি শরীর দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কার লাশ। ডিপোর ভিতরের অবস্থা আরো ভয়াবহ ক্যামিকেলযুক্ত বিষাক্ত ধোয়া ও আগুনের তাপে ঘটনাস্থলের কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরপর বিষ্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল সেই সাথে নতুন নতুন স্থানে আগুন জ্বলে উঠছে। কন্টেইনার বহনকারী গাড়ি ভিতর থেকে একটি একটি করে কন্টেইনার বাইরে নিয়ে আসছে। দরজা খুললেই ভিতর থেকে আগুনের শিখা বেরিয়ে আসছে। তবে মূল ঘটনাস্থল যেখানে আগুনের সূত্রপাত হয় সেখানে পৌছাতে পারেনি কেউই।

জানা যায়, আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের এই গাড়িটি আগুন নেভাতে ভিতরে প্রবেশ করে। এর কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে বিষ্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আর তাতেই সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যারা প্রথমে ভিতরে প্রবেশ করেন তাদের কেউই জীবিত বের হতে পারেননি। তাদের সাথে ডিপোর কর্মচারী যারা আগুন নেভাতে সহায়তা করছিল তাদেরও বেশিরভাগ মারা যান। ডিপো ও এর পাশ্ববর্তী পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে সেনা বাহিনীর সদস্যরা।

ডিপোর ভিতরে কেন্টিনে চাকরি করত মো. শোয়েব। শনিবার রাতে তার ডিউটি ছিল না। আগুন লাগার কথা শুনে তিনিও ছুটে যান ডিপোতে। রাত ১১টার পর ফেসবুকে আগুনের লাইভ দিচ্ছিলেন তিনি। ৩মিনিট পর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে ফেসবুক লাইভ বন্ধ হয়ে যায় তার এবং এরপর থেকে আর কোন খোঁজ নেই বলে জানান তাকে খুজঁতে আসা বড় ভাই মো রুবেল। আহাজারি করতে করতে তিনি বলেন, ভাইকে একবার দেখতে চাই জীবিত হোক কিংবা মৃত।