কাজ শুরুর তিন বছরেও সংস্কার হয়নি চট্টগ্রামের নালাও খাল: রয়ে গেলে অপরিস্কার ও অপরিচ্ছন্ন

 বশির আলমামুন |  রবিবার, অক্টোবর ১০, ২০২১ |  ৯:০৯ অপরাহ্ণ
       

বর্ষায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে তলিয়ে যায় বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। গত কয়েক বছর ধরেই নগরীর বিভিন্ন এলাকার নি¤œঞ্চলে দেখা যাচ্ছে এ দৃশ্য। এই নাগরিক দুর্ভোগ কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও সুফল মিলছে না। নগরবাসী বলছে সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সমন্বয়হীনতাই এর জন্য দায়ী। এই দুইটিটি প্রতিষ্টানের দন্ধে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের ১৩০০ কিলো মিটার ডেন গত তিন বছর ধরে সংস্কার হচ্ছে না। খাল, নালা সংস্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু করলে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে প্রকল্পের বাইরে থাকায় সিডিএ কর্তৃপক্ষও ড্রেন সংস্কার করছে না। দুই সংস্থার টানাটানিতে এখন প্রশ্ন উঠেছে, নগরীর ড্রেনের সংস্কার করবে কে? নাকি বছরের পর বছর সংস্কারহীন পড়ে থাকবে?
সিডিএ বলছে, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী তারা ৩০২ কিলোমিটার ড্রেন সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণ করবে। নগরীর বাকি ১৩০০ কিলোমিটার ড্রেন তাদের প্রকল্পে নেই। তাই সেগুলো সিটি করপোরেশনকে সংস্কার করতে হবে।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন বলছে, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে তাদের হাতে কোনও প্রকল্প নেই। তাই তারা ড্র্রেন গুলো সংস্কার করতে পারছে না। একই সমস্যার সমাধানে দুটি প্রকল্প নেওয়ার সুযোগও নেই। সিডিএ যেহেতু নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করছে। তাই নগরীর তিন ফুটের বেশি চওড়া ড্রেনগুলো সিডিএ-কে সংস্কার করতে হবে।
নগর পরিবেশবিদ মুক্তিযোদ্ধা ড. মুহাম্মদ ইদ্রিচ আলী বলেন, ‘নগরীর ১৩০০ কিলোমিটার ড্রেনের সংস্কার করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপরই বর্তায়। কারণ তাদের কাজ হলো-নগরীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, আলোকায়ন করা এবং নালা নর্দমা গুলোকে সংস্কার করা। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আগে তারাই কাজগুলো করতো। তাই এখনও প্রকল্পের বাইরের ড্রেনগুলো তাদেরই সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণ করতে হবে। তবে সিডিএ যদি চায় তারাও করতে পারে। ডিপিপি সংশোধনের মাধ্যমে এগুলো সংযোজন করে তারা জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অধীনে এই ড্রেনগুলোও সংস্কার করতে পারে। কিন্তু এর জন্য তাদের সিটি করপোরেশনের মতো দায়বদ্ধতা নেই।’
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসীর দুঃখ-ভোগান্তি ও হতাশা দীর্ঘদিনের। গত কয়েক বছর এটি অসহনীয় পর্যায়ে রূপ নিয়েছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর নিন্মাঞ্চল তলিয়ে যায়। বর্ষা এলেই বন্দর নগরীর অধিকাংশ এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর সমান জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তলিয়ে যায় বাসা-বাড়ি, বাজারঘাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর জন্য নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে খাল, নালা অপরিষ্কার এবং সংস্কারহীন থাকাকে দায়ী করছেন। বিশেষ করে গত তিন বছর ড্রেনগুলো সংস্কার না করার কারণে জলাবদ্ধতা এখন আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে। অন্যদিকে নিয়মিত খাল-নালা পরিষ্কার না করায় জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিডিএ’র এক প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল নগরীর দুই নম্ব গেইট এলাকা থেকে জলাবদ্ধতার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকে সিটি করপোরেশন নগরীর কোনও ড্রেন সংস্কার ও পরিষ্কার করছে না। যে কারণে নগরীর ১৬০০ কিলোমিটার ড্রেনের মধ্যে ১৩০০ কিলোমিটারই সংস্কারহীন পড়ে আছে। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সুফল পেতে হলে এসব ড্রেনগুলোকে অবশ্যই সিটি করপোরেশনকে সংস্কার করতে হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা সত্য, আমরা গত তিন বছর জলাবদ্ধতা সংশ্লিষ্ট কোনও নালা-খাল সংস্কার করছি না। এ সংশ্লিষ্ট আমাদের কোনও প্রকল্প নেই। তাই তিন ফুটের চেয়ে কম চওড়া যেসব ড্রেন আছে সেগুলো পরিষ্কার করছি। গত অর্থ বছরে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নালা থেকে এক লাখ ১৫ হাজার ঘনফুট মাটি উত্তোলন করেছি। এর বাইরে খাল-নালা পরিষ্কারে কোনও কাজ করা হয়নি।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি বিষয়ে দুটি প্রকল্প হয় না। আমরা জলাবদ্ধতা নিয়ে একটি প্রকল্প এখন পাঠালে মন্ত্রিসভা সেটি কোনোভাবে পাস করবে না। যেহেতু সিডিএ জলাবদ্ধতার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তাদেরকেই ১৩০০ কিলোমিটার ড্রেন সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে তারা ডিপিপি সংশোধন করে আবার পাঠাবে। জলাবদ্ধতা নিয়ে তারা কাজ করছে, এখন যদি আমরা কাজ করি, তাহলে কাজ নিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হবে।
জলাবদ্ধতা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কোর সূত্রে জানা যায়, বন্দর নগরী চট্টগ্রামে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটারের মতো ড্রেনেজ সিস্টেম আছে। এর মধ্যে সিডিএ’র নেওয়া জলাবদ্ধতা প্রকল্পের অধীনে ৩০২ কিলোমিটার ড্রেনেজ সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণ করার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে তারা ৩০২ কিলোমিটার ড্রেনই সংস্কার করা হবে। ইতোমধ্যে ড্রেনের কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল শাহ আলী।
এর বাইরে প্রকল্পে নতুন সাইড ড্রেন নির্মাণ করা হবে ১০ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার। ক্রস ড্রেন কালভার্ট নির্মাণ করা হবে ২০০টি এবং ১৫ দশমিক ৫০ কিলোমিটার রোড সাইড ড্রেনের সম্প্রসারণ করা হবে।
লে. কর্নেল শাহ আলী বাংলা বলেন, পুরো চট্টগ্রাম শহরে ১৬০০ কিলোমিটার ড্রেন আছে। এর মধ্যে আমাদের প্রকল্পে আছে মাত্র ৩০২ কিলোমিটার। এই ১৬০০ কিলোমিটার ড্রেনের হিসাব আমার কাছে নেই। আমরা সেই ড্রেনগুলোই সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণ করছি, যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়। ওইসব এলাকার পানি খালে নেওয়ার জন্য ড্রেনগুলো দরকার। প্রবর্তক মোড়ের কথা ধরেন, মোড়ের পাশে হিজড়া খাল। ওই খালে পানি নেওয়ার জন্য মোড় এলাকায় যেসব ড্রেন আছে যেগুলো সংস্কার, পুনর্র্নিমাণ করলে পানি আটকাবে না।
তিনি আরও বলেন, আর যে এলাকায় জলাবদ্ধতা হয় না। সেখানে ১০ ফুট চওড়া ড্রেন থাকলেও আমরা সেটিতে হাত দেবো না। জলাবদ্ধতার সর্ম্পক নেই এমন ড্রেন যত বড়ই হোক তার সঙ্গে প্রকল্পের কোনও সর্ম্পক নেই বলে জানান তিনি।