জোট বড় করতে মরিয়া বড় দুই দল

 ঢাকা ব্যুরো |  শনিবার, জানুয়ারি ২১, ২০২৩ |  ৮:৩৫ অপরাহ্ণ
       

নির্বাচনে ছোট ছোট দল গুলো অংশ নিলেও তারা বিজয়ী হতে পারে না। ফলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে বড় দলগুলোর কাছে ভিরতে চায় ছোট দলগুলো। কিন্তু বড় দল গুলোও মুখিয়ে থাকে ছোট দল গুলোর দিকে। তাদের পক্ষে তেমন জনসমথন না থাকলেও রাজনীতির মাঠ গরম করতে নিজেদের পক্ষের পাল্লা ভারী করতে আওয়ামী লীগ বিএনপির কাছে কদর বাড়ে ছোট দলের নেতাদের। আগামী নির্বাচনকেও সামনে রেখে আওয়ামী লীগ বিএনপি নিজেদের জোটকে বড় করতে ছোট দল গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনেও ছোট দল গুলোকে নিজেদের পক্ষে টেনে জোট ভারি করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রকাশ্যে বা গোপনে ছোট দলের নেতাদের সাথে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ নিজে থেকেও বড় দল গুলোর সাথে আগ বাড়িয়ে যোগাযোগ করে নির্বাচনে নিজের দলের আসন সংখ্যা নিশ্চিত করতে চাচ্ছে।

সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসহ ১০ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে রয়েছে বিএনপি। এই আন্দোলনে যেসব জোট ও দল রয়েছে তাদের অধিকাংশেরই নিবন্ধন নেই। বেশিরভাগই নাম ও প্যাডসর্বস্ব দল। নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৬টি দলের। বেশ কয়েকটির নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। আবার সমমনা গণতান্ত্রিক জোটের ১৫ সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলই নয়। তারা বিভিন্ন ইস্যুতে জাতীয় প্রেস ক্লাব কেন্দ্রিক কর্মসূচি পালন করে থাকেন।

তবে বিএনপি এসব দিকে নজর না দিয়ে ডান-বামসহ বিভিন্ন ধারাকে ঐক্যবদ্ধ করে বর্তমান সরকারকে সরানোর ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য দলটি ক্ষমতাসীনদের বলয়ে থাকা দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে জানা গেছে। বিএনপি চায়, ক্ষমতাসীন দলকে ক্রমশ দুর্বল করে দিতে। ১৪ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে আসা শরীফ নুরুল আম্বিয়ার জাসদের সঙ্গেও বিএনপি ও তার মিত্রদের একটি অংশের যোগাযোগ আছে বলে জানা গেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত তাদের কাউন্সিলে অতিথি হিসেবে গিয়েছিলেন বিএনপির মিত্র জোট গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা আ স ম আবদুর রব ও গণফোরাম (একাংশ) সভাপতি মোস্তফা মোহসীন মন্টু।

সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পাটির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গেও কিছুটা ‘ঘনিষ্ঠ’ যোগাযোগ গড়ে তুলেছিল বিএনপি। নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর ছেলের বিয়েতে উপস্থিত হয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্য বিএনপি নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে আসন নিয়েছিলেন তিনি। মনে করা হয়, বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের কারণেই ওই বিয়েতে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। এর পরই তিনি তার বক্তব্যে সরকারের নানা অসঙ্গতির কথা তুলে ধরছিলেন। যদিও আদালতে মামলা ও পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে সমঝোতার পর বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগটা স্তিমিত হয়ে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এ ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গঠিত সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বিএনপি। বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে সাতদলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, ১২ দলীয় জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, চার দলের বাম গণতান্ত্রিক ঐক্য, ১৫ সংগঠনের সমমনা গণতান্ত্রিক জোট ছাড়াও এলডিপি, গণফোরাম রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। প্রথম কর্মসূচির পর যুগপৎ আন্দোলনের আর কোনো কর্মসূচি দেয়নি তারা। নতুন গঠিত ১২ দলীয় জোট বিদ্যুতের দাম হ্রাসের দাবিতে যুগপতের কর্মসূচি ঢাকায় এক দিন পর করেছে। গণফোরাম এ কর্মসূচি পালন না করে বিবৃতি দিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। আর গণতন্ত্র মঞ্চের কর্মসূচিতে আসেনি এ জোটের অন্যতম শরিক দল নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন দল গণঅধিকার পরিষদ। যদিও তারা বলছেন, সামনের দিনগুলো তারা একসঙ্গে থাকবেন।

এদিকে বিএনপির সাবেক এক এমপি ড. আবদুর রহমান, বিএনপির পিরোজপুর জেলা কমিটির সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার সরওয়ার হোসেন ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য মেজর (অব.) মু. হানিফের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) নামের আরেকটি দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। এই দলটিকেও বিএনপির বিক্ষুব্ধ অংশটির আশ্রয়স্থল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও বিএনএম-এর নেতার জানিয়েছেন, তারা স্বতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দল। বিএনপির বিকল্প দল নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর ৫৪ দলীয় জোটের বিপরীতে ক্ষমতাসীন দলও নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য উদ্যোগী হয়েছে। সম্প্রসারিত ঐক্যের রূপরেখা এখনো স্পষ্ট না হলেও একসঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বিষয়টিতে ঐকমত্য হয়েছে।
নির্বাচন কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে এই ক্ষমতসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে নানা ঘরানার দল যোগ দিয়েছে। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দি¦তাপূর্ণ হবে ধরে নিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি অথবা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী মহাজোট সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটিও।
ভিন্ন একটি প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এরকম ১৪টি দল নিয়ে জোট গঠিত হলেও বিভিন্ন সময়ে জোট সম্প্রসারণের প্রস্তাব উঠলেও জোটের শরিকদের আপত্তির কারণে তা আর সম্প্রসারিত হয়নি। কিন্তু বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর জোটের আকৃতি বৃদ্ধি পাওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কেন্দ্র করে একই মতাদর্শে বিশ্বাসী ২০ দলীয় জোটে অংশীদার, বাম ঘরানার দল এমনকি ইসলামী ভাবাপন্ন দলগুলোর সঙ্গেও আলাপ আলোচনা করছেন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা। নির্বাচনী মহাজোট না ১৪ দলের অংশ হবে, তা চূড়ান্ত না করলেও ক্ষমতাসীন দলের জোটে কয়েকটি দল যোগ দেবে, তা প্রায় আলোচনার শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতা এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।
জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত হতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে সরে আসা দল থেকে শুরু করে বাম ধারার দলগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি দল ও ইসলামী দলগুলোর সঙ্গেও চলছে আলোচনা। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের জোটে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত না হলে সমঝোতার ভিত্তিতে আলাদা প্ল্যাটফর্ম গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একসুরে নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেবেন বলেও জানিয়েছেন শীর্ষ নেতারা।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে সরে আসার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সমালোচনা করলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে কখনো যোগ দেননি। কিন্তু এবার ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে নির্বাচনী জোটের অংশীদার হতে পারেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। তিনি ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাতে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের আগের দিন। ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সম্মেলনেও উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র আরও জানায়, ইসলামী দলগুলোর মাঝে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর) নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এমনকি ইসলামী দলগুলোর নেতৃত্বে গঠিত হতে পারে আলাদা একটি নতুন মোর্চা।

তবে ১৪ দলে নতুন কোনো দলের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোট শরিকদের আপত্তি রয়েছে। যেহেতু ১৪ দল একটি আদর্শিক জোট, এখানে নতুন কোনো দলের অন্তর্ভুক্তি হলে তাকে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হতে হবে, একই চেতনায় বিশ্বাসী হতে হবে। গত ৮ ডিসেম্বর জোটের মুখপাত্র আমির হোসেন আমুর ইস্কাটনের বাসায় ১৪ দলের এক সভায় তিনি নতুন দলের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব উত্থাপন করলে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ কয়েকজন এর বিরোধিতা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জোটের আরেক নেতা বলেন, এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে নির্বাচনের বিষয়ে কয়েকটি দলের সমঝোতা হবে। এমনকি বিএনপি ভেঙে বিকল্পধারা বাংলাদেশ গঠন করা সাবেক রাষ্ট্রপতি বি চৌধুরী আওয়ামী লীগের জোটেই থাকবেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘নতুন দল যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তো আছেই। ১৪ দল একটি একটি আদর্শিক জোট। তাত্ত্বিকভাবে যাদের সঙ্গে মিলবে, তাদের বাইরে তো কোনো দলকে নেওয়া হবে না। গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সঙ্গে আমাদের নির্বাচনী ঐক্য হতে পারে। আদর্শিক ঐক্য হতে পারে। সেই সম্ভাবনা আছে।