জড়িত সার পরিবহনকারী ঠিকাদার সিন্ডিকেট. মিলছে না বাফার গোডাউনের সুবিধা

সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভেজাল টিএসপি সার!

টিএসপির যোগসাজশ এবং পুলিশি তদন্তে অবহেলার অভিযোগ

 নিজস্ব প্রতিবেদক |  মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২২ |  ২:১৭ অপরাহ্ণ
       

সরকার কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভর্তুকি দিয়ে কমমূল্যে সার দেন সারাদেশের কৃষকদের। ভর্তুকির সারের মধ্যে টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) তার অন্যতম। আর এক শ্রেণীর সিন্ডিকেট সরকারি এসব সার পরিবহনের আড়ালে পথিমধ্যে ভেজাল মিশ্রণ করে ছড়িয়ে দিচ্ছে সারাদেশে। আসল সারে এসব ভেজাল মিশ্রণের কাজে জড়িত রয়েছে এক শ্রেণীর পরিবহন ঠিকাদার সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, সার পরিবহনের ঠিকাদারদের সাথে করা চুক্তির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সারে ভেজাল মিশ্রণ সহজতর হচ্ছে সিন্ডিকেটের। এর পেছনে সরকারি সার উৎপাদনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেডের (টিএসপিসিএল) এক শ্রেণীর কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে ইতোপূর্বেকার মামলা তদন্তে পুলিশী অবহেলারও।
সারাদেশে সরকার পরিবহন নিয়ে সমালোচনা এড়াতে ২০২১ সালে সারাদেশে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের (বাফা) বেশ কয়েকটি গোডাউন নির্মাণ করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি)। সরকারি কারখানায় উৎপাদিন সার জেলা পর্যায়ে বাফার গোডাউনে মজুদ করে স্থানীয় ডিলারদের সরবরাহ করে বিসিআইসি। সারে ভেজাল মিশ্রণ ও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে বাফার গোডাউন নির্মাণ করা হলেও সেই সুফল মিলছে না। এখন ডিলারদের কাছে যাওয়ার আগেই পরিবহন ঠিকাদাররা সারে ভেজাল মিশিয়ে সরবরাহ করছে বাফার গোডাউনে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে যশোর বাফার গোডাউনে ভেজাল সার ধরা পড়ে। এ নিয়ে ঠিকাদার ও এক প্রতিনিধিসহ দুইজনের বিরুদ্ধে যশোর কোতোয়ালী থানায় মামলাও দায়ের করে। ওই মামলায় দুই আসামী উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিলেও পুলিশ আর কাউকে আইনের আওতায় আনতে পারেননি। এমনকি যে ট্রাকগুলো পুলিশ জব্দ করেছিল, সেইসব ট্রাকের চালক-হেলপারদেরও আইনের আওতায় আনা হয়নি বলে অভিযোগ। সর্বশেষ গত ২৯ আগস্ট বগুড়ায় ভেজাল সারের আরেক চালান ধরা পড়ে।
টিএসপিসিএল সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত টিএসপি কমপ্লেক্স সার কারখানা থেকে গত ২৭ খেবে ২৯ আগস্ট তিন চালানে ১৮ ট্রাকে টিএসপি সার বগুড়া বাফার গোডাউনে পাঠানো হয়। তন্মধ্যে ২৭ আগস্ট ১২ ট্রাক, ২৮ আগস্ট ৫ ট্রাক এবং ২৯ আগস্ট ১ ট্রাক সার বগুড়া পাঠানো হয়। তন্মধ্যে তন্মধ্যে ৭ ট্রাক ২৯ আগস্ট সকালে বগুড়া গোডাউনে পৌঁছে। তন্মধ্যে ওইদিন সকালে ঢাকামেট্রো-ট-১৬-৯৮৮৩ নম্বরের ট্রাক থেকে সার আনলোড করার সময় আগের দেওয়া টিএসপি সারের সাথে ভিন্নতা দেখতে পান বাফার গোডাউন ম্যানেজার মোস্তফা কামাল। সারের বস্তাগুলোতেও অসামঞ্জস্যতা দেখে তিনি সার আনলোড বন্ধ করে দিয়ে টিএসপি ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সারগুলোর বিষয়ে অবহিত করে চিঠি দেন। এরমধ্যে বগুড়া জেলা প্রশাসক বিষয়টি জানতে পেরে ওই ৭ ট্রাক থেকে সারের নমুনা সংগ্রহ করে দ্রুত পরীক্ষার নির্দেশ দেন। ইতোমধ্যে ৩০ আগস্ট সবগুলো ট্রাক বগুড়া বাফার গোডাউনে পৌঁছে। এসব সার পরিবহনের দায়িত্ব ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগরীর দেওয়ান হাট এলাকার এম এইচ ভবনের মেসার্স এম এইচ আর করপোরেশনকে। এসব সার পরিবহনে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন আবু তাহের নামের আরেক জন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) ও বগুড়া বাফার গোডাউনের ম্যানেজার মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বাফার গোডাউনে আগে যেসব সার এসেছে, তা থেকে ভিন্নতা পাওয়া যাওয়ায় ২৯ আগস্ট সার আনলোড বন্ধ করে দিয়ে আমরা টিএসপিসহ বিষয়টি স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম।’
এরমধ্যে টিএসপি কর্তৃপক্ষ টিএসপিসিএলের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান রসায়নবিদ রেজাউল হককে আহবায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটিতে টিএসপিসিএলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মাজহারুল ইসলাম সদস্য এবং সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আওয়াল হোসেন সদস্য সচিব করা হয়। ৩০ আগস্ট ওই কমিটি বগুড়ায় গিয়ে ১৮ ট্রাক থেকে সারের নমুনা সংগ্রহ করে।
এদিকে বগুড়া জেলা প্রশাসনের তদন্ত টিম রাজশাহী মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে নমুনা পরীক্ষা করে সবগুলো ট্রাকেই ভেজাল সারের অস্থিত্ব পান। এরপর টিএসপির তদন্ত কমিটি গত ১ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে ওই ৭টিসহ ৯টি ট্রাকে ভেজাল সারের অস্থিত্ব পান। এ ব্যাপারে টিএসপিসিএলের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান রেজাউল হক বলেন, আমরা ১৮ ট্রাক থেকে নমুনা নিয়েছিলাম। ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে টিএসপি কমপ্লেক্স। নমুনা পরীক্ষায় ভেজালের বিষয়টি পাওয়া গেছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
এনিয়ে ২ সেপ্টেম্বর টিএসপিসিএলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মাজহারুল ইসলাম বাদী হয়ে পরিবহন ঠিকাদার মেসার্স এম এইচ আর করপোরেশনের স্বত্ত্বাধীকারী মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (৬০), তাদের প্রতিনিধি মো. আবু তাহের(৩১)সহ ভেজালপাওয়া ট্রাকগুলোর চালক হেলপারসহ ১৮ জনকে আসামী করে বগুড়া সদর থানায় মামলা দায়ের করেন। ভেজাল পাওয়া ট্রাকগুলো হচ্ছে, ঢাকামেট্রো-ট-১৮-৯৮৮৩, ঢাকামেট্রো-ট-১৮-০৫৮৭, বগুড়া-ট-১১-১০৪৯, ঢাকামেট্রো-ট-১৬-৯৩২৩, ঢাকামেট্রো-ট-১৪-৫৪০১, ঢাকামেট্রো-ট-১৪-৭৮৩৪, ঢাকামেট্রো-ট-১৬-৫৩৮৫, ঢাকামেট্রো-ট-১৮-৭৫২৩ এবং ঢাকামেট্রো-ট-১৪-০৮৯৯। এখানে ১২৬ টন ভেজাল সার পাওয়া যায়। এসব মামলায় র‌্যাব ও পুলিশ ১৮জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মূল ঠিকাদার মোয়াজ্জেম হোসেন ও প্রতিনিধি আবু তাহের গ্রেপ্তার হননি।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া সদর থানার ওসি সেলিম রেজা বলেন, টিএসপি কমপ্লেক্সের পক্ষ থেকে ভেজাল সারের বিষয়ে একটি মামলা দিয়েছে। ওই মামলায় ৯ ট্রাকের চালক হেলপার মিলে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম টিএসপি কমপ্লেক্স থেকে সারাদেশে বাফার ২৫ গোডাউনে সার পাঠানো হয়। এসব সার পরিবহনের জন্য বেশ কয়েকজন ঠিকাদার রয়েছেন। এসব পরিবহন ঠিকাদারদের অনেকে জড়িয়ে পড়েছেন সার ভেজাল ও কালোবাজার চক্রে। সর্বশেষ বগুড়া বাফার গোডাউনে ১৮ ট্রাকে ২৫২ টন সার পাঠায় টিএসপি কমপ্লেক্স। তন্মধ্যে ১২৬ টন সারে ভেজাল পাওয়া যায়। এসব সার পরিবহনের দায়িত্বে ছিলেন ঠিকাদার মেসার্স এমএইচ আর করপোরেশন।
টিএসপি সূত্রে জানা গেছে, এম এইচ আর করপোরেশনের সাথে ২০ হাজার ১২৫ টন টিএসপি সার ১০টি বাফার গোডাউনে পরিবহনের জন্য চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি চুক্তি করে টিএসপিসিএল। এরপর থেকে সার পরিবহন করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি ও কার্যাদেশের শর্ত মতে, বগুড়ায় প্রতিটন ২৫০০ টাকা করে ২২৫০ টন, রাজশাহীতে প্রতিটন ২৬০০ টাকা করে ১৫০০ টন, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়িতে প্রতিটন ২৫৫০ টাকা করে ২২৫০ টন, গাইবান্ধায় প্রতিটন ২৮৫০ টাকা করে ১৫০০ টন, লালমনিরহাট মহেন্দ্রনগর বাফার গোডাউনে প্রতিটন ৩০৫০ টাকা করে ১৫০০ টন, দিনাজপুরে প্রতিটন ৩১০০ টাকা করে ১৭৫০ টন, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিটন ৩১০০ টাকা করে ১৫০০ টন, মাদারীপুরের টেকেরহাট গোডাউনে প্রতিটন ২৯০০ টাকা করে ৩০০০ টন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার এন্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডে প্রতিটন ২০০০ টাকা করে ১৮৭৫ টন এবং সিলেট শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডে প্রতিটন ২৫০০ টাকা করে ৩০০০ টন মিলে ৫ কোটি ৪১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫শ টাকায় (আনলোডিং, স্ট্যাকিং খরচ ও ভ্যাটসহ) ২০ হাজার ১২৫ টন টিএসপি সার পরিবহন করার বিষয় নির্ধারিত হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেসার্স এম এইচ আর করপোরেশন পরিবহন ঠিকাদার কাজ নেওয়া পর থেকে মাঝিরঘাটের পরিবহন ব্যবসায়ী মেসার্স মুন এন্টারপ্রাইজের মিজানুর রহমান মিলে এ সার ভেজাল করে আসছিল। বেশ কিছু ট্রাক মালিক ও চালকদের নিয়ে তার একটি শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে। এর আগে যশোরে ধরা পড়া চালানটি ভেজাল মিশ্রণে জড়িত ছিল মিজানুর রহমান।
এ ব্যাপারে কথা হলে মেসার্স এম এইচ আর করপোরেশনের স্বত্ত্বাধীকারী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমাদের সারে কোন ভেজাল ছিল না। আমাদের ফাঁসানো হয়েছে।’ মেসার্স মুন এন্টারপ্রাইজের মিজানুর রহমানের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পুরো বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি মুন এন্টারপ্রাইজ কিংবা মিজান নামে কাউজে চিনি না। এ ধরণের কারো সাথে আমার ব্যবসা নেই।’ তবে তার বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে তারই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আশফাক আহমেদ হিরুর বক্তব্যে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স এম এইচ আর করপোরেশনের ম্যানেজার আসফাক আহমেদ হিরু বলেন, ‘আমি এম এইচ আর করপোরেশনে চাকুরি করি। আমরা টিএসপির কেরিং কন্ট্রাক্টর, পরিবহন করি। বিসিআইসি’র ৮টি প্রতিষ্ঠানের পণ্য আমরা পরিবহন করি। বিএডিসির ১০ লক্ষ টন সার আমরা পরিবহন করেছি।
মুন এন্ট্রারপ্রাইজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুন এন্টারপ্রাইজ আমাদের সবসময় গাড়ি সাপ্লাই দেয়। সেই বড় কার্লপ্রিট। সে-ই আমাদের বিপদে ফেলেছে। আজকে ৩০ বছর লক্ষ লক্ষ টন মাল পরিবহন করি। আমাদের কোন খারাপ রেকর্ড নেই।’ এ বিষয়ে জানতে গত কয়েকদিন ধরে মেসার্স মুন এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধীকারী মিজানুর রহমানের মুঠোফোনে কল দেওয়া হয়। প্রথমে কল রিসিভ করে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জেনে ব্যস্ত জানিয়ে লাইন কেটে দেন। সর্বশেষ শনিবার দুপুরে কল দেওয়া হলে তার ফোনটি রিসিভ করেন অপরপ্রান্তে সাগর পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি। সাগর বলেন, আমি মুন এন্টারপ্রাইজের কর্মচারী। অফিসে কাজ করি। সারের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। (শুক্রবার) সকালে ফোনটি অফিসে রেখে মিজান সাহেব বেরিয়ে গেছেন। এখনো অফিসে আসেননি। তার সাথে আমার যোগাযোগ হয়নি।
বগুড়ায় সারে ভেজাল মিশ্রণের ঘটনায় আটককৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানিয়েছে, বগুড়ায় বাফা গুদামের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া ট্রাকগুলোতে ভেজাল সার তোলা হয় সাভারের হেমায়েতপুর থেকে। সেখানেই টিএসপির আসল সারগুলো নামিয়ে আগে থেকে প্রস্তুত রাখা ভেজাল সারগুলো ট্রাকে তোলা হয়েছে।
তাছাড়া সারে চুক্তির শর্তের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সারে ভেজাল মেশানোর সুযোগ নেয় বিপদগামী পরিবহন ঠিকাদারেরা। মেসার্স এম এইচ আর করপোরেশনের সাথে সম্পাদিত চুক্তির ৩ এর (ঝ)নং শর্তে উল্লেখ রয়েছে, পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ট্রাক ব্যবহার করতে হবে। টিএসপিসিএল হতে টিএসপি সার উত্তোলনের সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বাফার কিংবা কারখানার গোডাউনে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে। ব্যর্থ হলে পরবর্তী ৭ দিন প্রতিদিন প্রতি মে.টনে ২ টাকা হারে এবং পরবর্তী ৭ দিন প্রতিদিন ৩ টাকা হারে জরিমানা ধার্য হবে। যা পরিবহন বিল থেকে কর্তনযোগ্য।
এই শর্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সার ট্রাক টিএসপিসিএল থেকে লোড করার পর ৭ দিনের মধ্যে নির্দিষ্ট গন্তব্যে না পৌঁছনে পরবর্তী ৭দিন প্রতিটন দুই টাকা হারে প্রতি ট্রাকে (প্রতি ট্রাকে ১৪ টন সার) একদিনে জরিমানা আসে ২৮ টাকা। যা ৭ দিনে আসে ১৯৬। পরবর্তী ৭দিন প্রতিটন তিন টাকা হারে একদিনে জরিমানা আসে ৪২ টাকা। যা ৭ দিনে মাত্র ২৯৪ টাকা আসে। অর্থাৎ সার লোডের ২০ দিন পর গন্তব্যে পৌঁছলে এক ট্রাকে জরিমানা আসবে মাত্র ৪৯০ টাকা। অথচ বগুড়ার ওই গন্তব্যে ১৪টন সার পরিবহনের ব্যয় আসে ৩৫ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিএসপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আতাউর রহমান বলেন, ‘বগুড়ায় সার ভেজালের ঘটনায় আমরা মামলা করেছি। বগুড়ার আদালতে একজন আইনজীবী নিয়োগে করার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। তাছাড়া ঠিকাদারের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা বিসিআইসিকে জানিয়েছি। বিসিআইসি থেকে যে নির্দেশনা পাওয়া যাবে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
অন্যদিকে যশোর বাফার গোডাউনে পৌছানোর জন্য চট্টগ্রাম টিএসপি কমপ্লেক্স থেকে গত ১৪ মার্চ ১১টি ট্রাকে ১৫৪ টন এবং ১৫ মার্চ ৬টি ট্রাকে ৮৭ টন মিলে ২৪১ টন টিএসপি সার গ্রহন করে পরিবহন ঠিকাদার মেসার্স সৈয়দ এন্টারপ্রাইজ। পরের ১৫ ও ১৬ মার্চ এসব সার যশোর পৌঁছানোর কথা থাকলেও ১৭ মার্চ ৫ ট্রাক সার পৌছায়। এসব সারে ভেজাল সন্দেহ হওয়ায় যশোর বাফার গোডাউন ম্যানেজার আকতারুল হক ৫ ট্রাকের সার খালাস বন্ধ করে দিয়ে লিখিতভাবে বিসিআইসি ও টিএসপি কর্তৃপক্ষকে জানায়। এরপর টিএসপিসিএল তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে ওইব সারে ভেজালের প্রমাণ পান। এরপর গত ২৭ মার্চ টিএসপিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মোহাম্মদ সোলায়মান বাদী হয়ে যশোর জেলার কোতোয়ালী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় মেসার্স সৈয়দ এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধীকারী মো. আহসান হাবিব এবং তার প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইব্রাহীম হায়দারকে আসামী করা হয়। মামলাটি তদন্ত করছেন যশোর কোতোয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক এজাজুল হক। ওই মামলার দুই আসামী উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন। পরবর্তীতে ওই মামলায় আর কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এজাজুল হক বলেন, ‘মামলার দুই আসামী হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছেন। আমরা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ এরপর তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত জানিয়ে আর কথা বলতে রাজি হননি। পরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।’
এদিকে সরকারি টিএসপি সারে ভেজাল মিশ্রণের ঘটনা বেশ পুরোনো। সারের ভেজাল রোধে টিএসপি সার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটিকে তেমন তৎপর থাকতে দেখা যায় না। এর সুযোগ নিয়ে আইনী মারপ্যাঁচে বেরিয়ে যান ভেজাল ও চোরাই সার পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
এ বিষয়ে কথা করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘টিএসপি কমপ্লেক্স সরকারি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান থেকে উৎপাদিত সার সরকার ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের সরবরাহ করে। সেই সারে ভেজাল ও পাচারে সিন্ডিকেট রয়েছে। অথচ এসব সারে ভেজাল হলে তার প্রতিরোধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় টিএসপি কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের। এতে বুঝা যায় চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের সাথে তাদের সখ্যতা রয়েছে। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিজের মনে করে সরকারি সম্পদ লুঠেপুঠে খাচ্ছেন। অন্যথা তাদের উচিৎ ছিল ভেজাল মিশ্রিত সার যারা পরিবহনের দায়িত্বে ছিল তাদের ডেকে এনে পুলিশে দেওয়া। আবার পুলিশেরও উচিত, কারা সারে ভেজাল মিশ্রণ করছে কিংবা পাচার করছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা। সারে ভেজাল হলে কৃষকরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ব্যাপারে টিএসপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আতাউর রহমান বলেন, যশোরে ভেজাল সার সরবরাহের অভিযোগে পরিবহন ঠিকাদার সৈয়দ এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত চলছে। ওই ঘটনায় আমরা ঠিকাদারের জামানত থেকে সারের ক্ষতিপূরণ আদায় করেছিলাম। পরে এসব বিষয়ে ঠিকাদার হাইকোর্টে দুইটি রিট করেছিল। একটি খারিজ হয়ে গেছে। আরেকটি তারা (ঠিকাদার) রায় পেয়েছে। আমরা এটার বিরুদ্ধে আপিল করতে যাচ্ছি। ভেজাল জব্দকৃত সার এখনো থানায় রয়েছে বলে জানান তিনি।