রাত ১১ টায় হাটহাজারীতে বাবুনগরীর দাফন

 নিজস্ব প্রতিবেদক |  বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৯, ২০২১ |  ৩:৪৬ অপরাহ্ণ
       

হেজাফতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর দাফন চট্টগ্রামের মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার কবরস্থানে হবে। রাত ১১ টায় মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে তাকে সেখানে দাফন করা হবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে হেফাজতের নায়েবে আমির সালাউদ্দিন নানুপুরী জানান, হেফাজতে আমিরের জানাজা একটাই হবে, সেটি হাটহাজারী মাদ্রাসায়।

তিনি আরও জানান, হেফাজতের সাবেক আমির প্রয়াত আল্লামা শফিকে যে কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল সেখানেই দাফন করা হবে বাবুনগরীকে।

প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল লাশ দাফন করা হবে ফটিকছড়ির বাবুনগর গ্রামে বাবুনগরীর পারিবারিক কবরস্থানে। পরে সিদ্ধান্ত হয় হাটহাজারী মাদ্রাসা কবরস্থানে বাবুনগরীকে শায়িত করা হবে।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি।
এর আগে আজ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় নিজ কক্ষে শোয়া অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন বাবুনগরী। পরে তাঁকে নগরীর প্রবর্তক মোড়ে সিএসসিআর হাসপাতালে নেওয়ার পর বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি ৫ মেয়ে ও ১ ছেলে রেখে গেছেন। সিএসসিআর হাসপাতালের সিইও ডা. সালাউদ্দীন মাহমুদ হেফাজত আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, গুরুতর অসুস্থ হেফাজত আমিরকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষনা করেন।
হাদিস শাস্ত্রের প্রবীণ শিক্ষক আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ১৯৫৩ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার বাবুনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম মুহাম্মদ জুনায়েদ হলেও তিনি জুনায়েদ বাবুনগরী নামে দেশব্যাপী পরিচিত। তার পিতা আল্লামা আবুল হাসানও ছিলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার তাফসির বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তার মা ফাতেমা খাতুন বাবুনগর মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হারুন বাবুনগরীর মেয়ে। হারুন বাবুনগরীর পিতা সুফি আজিজুর রহমান হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।

বাড়ির পার্শ্ববর্তী আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় তিনি মক্তব, হেফজ ও প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফজ শেষ করার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে ভর্তি হন। ১৯৭৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি হাদিসের উপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য পাকিস্তান যান। ১৯৭৮ এর শেষের দিকে তিনি পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে ২২ বছর আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন।
২০০৩ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করে আমৃত্যু ওই মাদ্রাসায় ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে আরবি, বাংলা ও উর্দু ভাষায় বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন।
তিনি অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর, দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব ও শায়খুল হাদিস, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম নূরানী তালীমুল কুরআন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাসিক মুঈনুল ইসলামের প্রধান সম্পাদক। এছাড়াও তিনি নাজিরহাট বড় মাদ্রাসার মুতাওয়াল্লী, মাসিক দাওয়াতুল হকের পৃষ্ঠপোষক, ইনসাফ ২৪.কম ও কওমিভিশন.কমের প্রধান উপদেষ্টা সহ কয়েকটি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃস্থানীয় পদে ছিলেন।
৫ বছর বয়সে বাবুনগরী আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে ভর্তি হন। এখানে তিনি মক্তব, হেফজ ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। কুরআনের হেফজ শেষ করার পর আজহারুল ইসলাম ধর্মপুরীর কাছে তিনি পুরো কুরআন মুখস্থ শুনিয়েছিলেন। এরপর তিনি ভর্তি হন দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসায়। ১৯৭৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসায় তার উল্লেখযোগ্য শিক্ষকগণের মধ্যে রয়েছেন: আব্দুল কাইয়ুম, আহমদুল হক (মুফতি), আবুল হাসান, আব্দুল আজিজ, শাহ আহমদ শফীসহ প্রমুখ।
তারপর উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি পাকিস্তান যান। ১৯৭৬ সালে করাচিতে অবস্থিত জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় তাখাচ্ছুছাত ফিল উলুমুল হাদিস তথা উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হন। ২ বছর হাদিস নিয়ে গবেষণা সম্পন্ন করে তিনি আরবি ভাষায় ‘সীরাতুল ইমামিদ দারিমী ওয়াত তারিখ বি শায়খিহী’ (ইমাম দারিমী ও তার শিক্ষকগণের জীবন বৃত্তান্ত) শীর্ষক অভিসন্দর্ভ জমা দেন। এই অভিসন্দর্ভ জমা দেওয়ার পর তিনি জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়া থেকে হাদিসের সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন।
কর্মজীবনে জুনায়েদ বাবুনগরী ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করে বাবুনগর মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। বাংলাদেশের মাদ্রাসা সমূহের সর্বপ্রথম বাবুনগর মাদ্রাসায় তিনি উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগ চালু করেন। ২০০৩ সালে তিনি দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসায় যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি হাটহাজারী মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক নিযুক্ত হন। ২০১৯ সালের মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘শিক্ষকতা জীবনে এ পর্যন্ত আমার ছাত্র সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি।
২০১০ সালে তাকে মহাসচিব করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির আমীর মারা যাওয়ার পর ১৫ নভেম্বর সংগঠনের একটি কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে তিনি আমির নির্বাচিত হন। পরে কমিটি বিলুপ্তির পরও আহ্ববায়ক কমিটিতে তাকে আমির নির্বাচিত করা হয়।
আরবি, উর্দু ও বাংলায় তার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ত্রিশটি। দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার আরবি পত্রিকা আল বাসুল ইসলামি, দারুল উলুম দেওবন্দের মাসিক পত্রিকা আদ দায়ী, দারুল উলুম হাটহাজারীর মাসিক আল মুঈন সহ বিভিন্ন সাময়িকীতে তার অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। কাতারের আল আরব পত্রিকায় তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল।