ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে ফিশিং শিল্পে অস্থিরতা

৮ মাসের ব্যবধানে জ্বালানি খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ

 নিজস্ব প্রতিবেদক |  রবিবার, আগস্ট ৭, ২০২২ |  ৩:৩৯ অপরাহ্ণ
       

মানুষের দেহের আমিষের মূল উপাদান মাছের বড় অংশের যোগান আসে সামুদ্রিক মৎস্য থেকে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে খরচ বেড়ে যাবে। বাড়বে মাছের দামও। এতে ফিশিং সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষতির প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের উপর। এদিকে সরকারিভাবে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষনার পর শনিবার সকাল থেকে সাগরে মাছ শিকারে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো।
ফিশিং শিল্পে জড়িতরা বলছেন, ৮ মাসের ব্যবধানে দুই বার ডিজেলের দাম বেড়েছে। ৬৫ টাকার ডিজেল ৮ মাসের ব্যবধানে ১১৪ টাকা হয়েছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়াতে ফিশিং সেক্টর বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে। কারণ সামুদ্রিক মৎস্য শিকারে ব্যবহৃত নৌযানের জ্বালানিতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়। এখন ফিশিংয়ের ব্যয় বেড়ে যাবে। বাড়বে মাছের দামও। এতে এ শিল্পের জড়িতরা বাদেও ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
মেরিন হোয়াইট ফিশ ট্রলারস ওনার্স এসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছৈয়দ আহমেদ বলেন, আমাদের স্টিল বডি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে প্রতিট্রিপে সাগরে মাছ শিকারে যেতে ৬০ থেকে ৮০ টন পর্যন্ত ডিজেল নিতে হয়। ১৮শ হর্স পাওয়ারের ট্রলারগুলোতে ১০০ টনের মতো ডিজেল লাগে। এখন ৮০ টাকার ডিজেল ১১৪ টাকা হয়েছে। এক লিটার ডিজেলের দাম ৩৪ টাকা করে বেড়েছে। এতে যাদের ১০০টন তেল লাগে, তাদের ৩৪ লক্ষ টাকা এক ট্রিপেই খরচ বেড়ে গেছে। ফলে এখন থেকে সাগরে মাছ শিকারে গেলে, খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সেই হিসেবে বাজারে মাছের দাম পাওয়া যাবে না। আবার মাছের দাম বাড়লেও তা সাধারণ ভোক্তাদের উপর প্রভাব পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘ফিশিং সেক্টরে জ্বালানি খরচটাই মূখ্য। আগে কখনো এই হারে জ্বালানির দাম বাড়েনি। এখন ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। এতে ফিশিং সেক্টর মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কি.মি. এলাকাজুড়ে বাংলাদেশের সীমানায় মৎস্য শিকার করেন প্রায় ৬৮ হাজার নৌযান। তন্মধ্যে প্রায় ৩৩ হাজার নৌযান রয়েছে ইঞ্জিন চালিত। এসব নৌযানের মাধ্যমে বছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ আহরণ করা হয়ে থাকে, যা আহরিত সামুদ্রিক মৎস্যের ৮১.৬৬ শতাংশ।
মেরিন হোয়াইট ফিশ ট্রলারস ওনার্স এসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সাগরে মাছ শিকারে নিয়োজিত নৌযানের মধ্যে ২৫২টি বাণিজ্যিক ট্রলার রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে ১৯০ স্টিলবডি ট্রলিং (বাণিজ্যিক ট্রলার), ৬০টি মতো কাটবডি ট্রলিং রয়েছে। তাছাড়া ইলিশ ও ম্যাকানাইজড কাটবোট রয়েছে ৩০-৪০ হাজারের মতো।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাটবডি ট্রলিংগুলো ১৪-১৫ দিনের জন্য ট্রিপে যেতে ১৬-১৭ টন ডিজেল নিয়ে যায়। ডিজেলের দাম বাড়াতে এখন প্রতি ট্রিপে শুধু জ্বালানিতেই ৫ লক্ষ টাকার বেশি খরচ বেড়ে গেছে। আবার ম্যাকানাইজ বোটগুলো ৬-৭ দিনের জন্য ট্রিপে গেলেও দুই থেকে তিন টন ডিজেল নিতে হয়। এতে ম্যাকানাইজ বোটের ক্ষেত্রেও প্রতি ট্রিপে ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ বেড়ে গেছে। এখন সাগরে ইলিশের মৌসুম। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়াতে, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাবে। যে কারণে শনিবার সকাল থেকে আমরা সাগরে ট্রলিং পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছি।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সড়কে বাস-ট্রাক মালিকরা অবরোধ করে ভাড়া বাড়িয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বর্ধিত ভাড়া আদায় করবেন। আমরা যারা সাগরে মাছ শিকারে যাই, তারা কার কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করবো?’
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ এসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘কোভিড শুরুর পর থেকে মেরিন ফিশারিজ শিল্পে দুর্দিন যাচ্ছে। আগে বছরে ১২ মাস আমরা মাছ শিকার করতাম। এখন ইলিশ প্রজনন, ফিডিং এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ৬ মাছ মাছ শিকার করা যায় না। বছরে ৬ মাস আমরা সাগরে ফিশিং করি। অথচ ব্যাংক লোনের সুদ দিতে হয় ১২ মাসের হিসেবে।’
তিনি বলেন, ফিশিং সেক্টরে বড় তিনটি খরচ রয়েছে। জ্বালানি, মেনটেনেন্স এবং স্ক্রু (নাবিকদের বেতন)। গত ৮ মাসের ব্যবধানে এখন শুধু জ্বালানি খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমাদের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো ২০-২২ দিনের একটি ভয়েজে সাগরে যায়। গত নভেম্বর মাসের শুরুতে যখন ডিজেল ৬৪ টাকা ছিল তখন আমাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে এক ভয়েজে ৫২ লক্ষ টাকার তেল লাগতো। যখন ৪ নভেম্বর থেকে ডিজেল ৮০ টাকা করা হয়, তখন ৭২ লক্ষ টাকা তেল লাগতো। এখন ১১৪ টাকা করাতে এক ভয়েছে এক কোটি ৫ লক্ষ টাকার তেল লাগবে। এতে মাছ শিকারের খরচও দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এতে বাজারে মাছের দামও বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যেতে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়। মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর বিদেশ থেকে মাংস আমদানি বন্ধ করে দেয় সরকার। কিন্তু মাছ আমদানি বন্ধ করেনি। এটি দেশীয় ফিশিং সেক্টরে মরার উপর খড়ার ঘা’র মতো। এ অবস্থা চলতে থাকলে ফিশিং সেক্টরের বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে এই সেক্টর দেউলিয়া হওয়ার আশংকা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।