ফাগুনের আগুনে মেতে উঠেছে চট্টগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম মহানগরে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো বসন্ত এসেছে ভালোবাসার বারোমাসি রঙ নিয়ে। গাছের শাখায় ফুটেছে পলাশ-শিমুল। সজীব পত্রপল¬ব, শাখায়-শাখায় পাখির কিচিরমিচির জানান দিচ্ছে প্রকৃতিতে বসন্তের অভিষেকের সুর। ফাগুনের আগুন লেগেছে রক্তরাঙা ফুলে। ১৪ ফেব্রুয়ারী রোববার ছিল ভালোবাসারও দিন। পহেলা বৈশাখের পর প্রকৃতির বর্ণিল রূপ-রঙকে বরণে বাঙালির আরেকটি উৎসবমুখরতার ক্ষণ বসন্তের আগমনী দিনটি। বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখের মতো বসন্তও আসে সম্মিলনের আবাহন নিয়ে। এবারও নগরজীবনে এসেছে বসন্ত, নানা রঙে ছুঁয়ে গেছে মানুষের মন।
এদিকে নগরের সিআরবিতে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের বসন্তবরণ অনুষ্ঠানে বাধা দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ১৪ ফেব্রুয়ারী রোববার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সিআরবির শিরীষতলায় উৎসবে বাধা দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে বাগবিতন্ডার সৃষ্টি হয়। এসময় অনুষ্ঠানে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তারা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অসৌজন্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ জানান।
প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সভাপতি রাশেদ হাসান বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শিরীষতলায় প্রমার বসন্তবরণ অনুষ্ঠান করতে অনুমতি নেওয়া হয়। তারা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করতে অনুমতি দেয়। তবে শর্ত দেয়, উচ্চস্বরে গান-বাজনা করা যাবে না।
রাশেদ হাসান বলেন, আজ বসন্তবরণ উৎসব। এখানে গান-বাজনা হবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। এটি প্রতিবছর আমরা করে আসছি। কিন্তু আজ (গতকাল) অনুষ্ঠান শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ওয়েলফেয়ার পরিদর্শক রুবাইত হোসেন এসে বাধা দেন।  
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিনিয়র ওয়েলফেয়ার অফিসার মো. আলী বলেন, তারা উচ্চস্বরে গান-বাজনা করছে। এজন্য বাধা দেওয়া হয়েছে। অনুমতি দেওয়ার সময় তাদের শর্ত দেওয়া হয়েছিল- অনুষ্ঠান করা যাবে, কিন্তু উচ্চস্বরে গান-বাজনা করা যাবে না।
সংস্কৃতিসেবীরা এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, আমাদের চেতনায় ভাস্বর মাতৃভাষার আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছেছিল এই কৃষ্ণচূড়া-পলাশ ফোটার বসন্তকালে। গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব অসহযোগ আন্দোলনও দানা বেঁধেছিল বসন্ত ঋতুতে। স্বাধীন বাংলাদেশেও গণতন্ত্রের দাবিতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বার বার পথ খুঁজে পেয়েছে বসন্তকালে। বসন্ত তাই বাঙালির জীবনে বাঁধনহারা হয়ে সৃষ্টির উল্লাসে প্রেমের তরঙ্গে ভাসার সময়। এমন আয়োজনে বাধা দেওয়া কারও কাম্য নয়।
তবে বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম ‘নিবিড় অন্তরতর বসন্ত এলো প্রাণে’ শিরোনামে চট্টগ্রাম থিয়েটার ইন্সটিটিউটে ও পাহাড়তলী আমবাগান রেলওয়ে জাদুঘর সংলগ্ন শেখ রাসেল পার্কে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করছে নানান আয়োজনে। এছাড়া সিআরবি শিরীষতলা মুক্তমঞ্চে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের আয়োজনে চলছে বসন্ত উৎসব। নগরের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও বসন্ত বন্দনায় মেতে উঠেছে।  
রোববার সকাল ৮টায় বোধন আবৃত্তি পরিষদ টিআইসিতে বসন্ত আবাহন, আবৃত্তি, সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, নৃত্য, শোভাযাত্রা, পিঠাপুলির সমারোহে দিনব্যাপী এ উৎসব উদযাপন করছে, যা রাত ৮টা পর্যন্ত চলে। এ বছর এই উৎসব ১৬ বছরে পদার্পণ করছে।  
বোধনের সভাপতি আবদুল হালিম দোভাষ জানান, উৎসবে সকালে ভায়োলিনিষ্ট চট্টগ্রামের পরিবেশনায় যন্ত্রসংগীত ও দলীয় সংগীত পরিবেশন করে সদারঙ্গ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত পরিষদ বাংলাদেশ, অভ্যুদয় সঙ্গীত অঙ্গন, গীতধ্বনি ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে ওডিসী অ্যান্ড টাগুর ড্যান্স মুভমেন্ট সেন্টার, নৃত্যম একাডেমি, রুমঝুম নৃত্যকলা একাডেমি, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, নৃত্য নিকেতন, অদিতি সঙ্গীত নিকেতন, সুরাঙ্গন বিদ্যাপীঠ, সঞ্চারী নৃত্যকলা একাডেমি, নটরাজ নৃত্যাঙ্গন একাডেমি, ঘুঙুর নৃত্যকলা একাডেমি।
বিকালে দলীয় আবৃত্তি পরিবেশন করে  বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম ও বোধন আবৃত্তি স্কুল চট্টগ্রাম। এছাড়া রয়েছে দেশের স্বনামখ্যাত শিল্পীদের পরিবেশনায় একক ও দ্বৈত সংগীত, একক আবৃত্তি, ঢোলবাদন ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।  
এদিকে শেখ রাসেল পার্কে বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানমালায় একক ও বৃন্দ আবৃত্তির পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের শিল্পীদের পরিবেশনায় দলীয় সংগীত ও দলীয় নৃত্য পরিবেশন করা হচ্ছে। এছাড়া রবীন্দ্র, নজরুল, আধুনিক ও লোকগান পরিবেশন করবেন প্রথিতযশা সংগীতশিল্পীরা।  
বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রাম এর আরেক অংশের সভাপতি সোহেল আনোয়ার জানান, বিকেল ৩টায় থাকছে উৎসব অঙ্গন থেকে বর্ণিল সাজে বসন্তবরণ শোভাযাত্রা। বসন্তের আগমনী বার্তায় ছন্দময় আবহ ছড়িয়ে দিতে রয়েছে ঢাক ঢোলকের মুন্সিয়ানা পর্ব।
সিআরবির শিরীষতলা মুক্তমঞ্চে প্রমার বসন্ত উৎসব সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়েছে। ঢোলবাদন, আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, কবিতা পাঠ ও যন্ত্রসংগীতের মধ্য দিয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত সংগঠনটি বসন্তকে বরণ করে নেয় ভালোবাসায়। পরে প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের এই বসন্তবরণ অনুষ্ঠানে বাধা দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
 তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে কিছুটা সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও নগরীতে বসন্ত উৎসবের প্রতিটি স্থানে সকাল থেকেই বসেছিল নানা বয়সী মানুষের সম্মিলন। বাংলার চিরায়ত গান, নাচ, আবৃত্তি, কথামালাসহ নানা আয়োজনে শুরু থেকেই মুখর উৎসব অঙ্গন। ভালোবাসা দিবস সেই আয়োজনে এনে দিয়েছে ভিন্নতাও। তবে করোনার কারণে উৎসব অঙ্গনের রূপ এবার কিছুটা ভিন্নও ছিল। সমবেতদের অনেকের মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে আয়োজকরা সচেতন ছিলেন। সমবেতদের কারও কারও মুখে মাস্ক ছিল, স্যানিটাইজার-মাস্ক বিলিয়েছেন আয়োজকরাও। আবার অনেকের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। করোনার কারণে প্রায় বছরজুড়ে সাংস্কৃতিক সম্মিলন বন্ধই ছিল কার্যত। বসন্ত আবাহনে ফের শুরু হওয়া সম্মিলনে তাই প্রাণচাঞ্চল্য ছিল খানিক বেশি।
কোলাহলমুক্ত ছায়া-সুনিবিড় এলাকাটিতে বোধনের বসন্ত উৎসবকে ঘিরে সকাল থেকেই শুরু হয় প্রাণের স্পন্দন। বসন্ত বাতাসের নতুন ফুলের গন্ধ যেন ছড়িয়ে পড়েছে জড়ো হওয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। মাথায় লাল-হলুদ ফুল। হলুদ শাড়ি পরে বাসন্তী সাজে সেজে নারী, হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে পুরুষ। কারও গায়ে আবার পলাশ রঙে রাঙা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবি অথবা শাড়ি জড়িয়ে শিশুরা শামিল হয়েছেন বসন্ত বরণে।

আপনার ভালো লাগতে পারে এমন আরো কিছু খবর